উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলীয় এলাকায় সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে উত্তাল হয়ে উঠেছে কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর। এর প্রভাবে পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় কয়েক দিন ধরে দমকা হাওয়া, থেমে থেমে বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে একের পর এক ট্রলার ঘাটে ফিরছে। ফলে ইলিশ মৌসুমের শুরুতেই চরম হতাশায় পড়েছেন উপকূলের হাজার হাজার জেলে ও ট্রলার মালিক।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সকালে আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দর ও খাপড়াভাঙ্গা নদীতে ফিরে আসা কয়েকটি মাছধরা ট্রলারের জেলে, মাঝি ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
জেলে জামাল বলেন, সাগর উত্তাল থাকায় মাছ ধরার অনুকূল পরিবেশ নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে অবস্থান করাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ১০ থেকে ১৫ দিনের প্রস্তুতি নিয়ে ট্রলার নিয়ে সাগরে গেলেও মাত্র এক-দুই দিন মাছ ধরার পরই বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে ঘাটে ফিরে আসতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন মাছের পরিমাণ কমছে, অন্যদিকে ট্রলার পরিচালনার বিপুল খরচও উঠছে না।
জেলেদের ভাষ্য, ইলিশ মৌসুম শুরুর আগে দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা মাছ ধরতে পারেননি। নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন করে সাগরে নামার পর দফায় দফায় বৈরী আবহাওয়া তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশানুরূপ ইলিশ ও সামুদ্রিক মাছ না পাওয়ায় অনেকেই লোকসানে পড়েছেন। এতে উপকূলীয় মৎস্যনির্ভর জনপদে দেখা দিয়েছে হতাশা।
কেউ কেউ পেশা পরিবর্তনের চিন্তা করছেন, আবার দাদনের দায়ে অনেকে বাধ্য হয়ে এ পেশায় টিকে আছেন।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শত শত মাছধরা ট্রলার সাগর থেকে ফিরে পটুয়াখালীর অন্যতম বৃহৎ মৎস্যবন্দর আলীপুর-মহিপুর ও খাপড়াভাঙ্গা নদীতে আশ্রয় নিয়েছে।
আলীপুর মৎস্যবন্দরের দীর্ঘবছরের ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা সাগরে যাওয়ার পর থেকেই দফায় দফায় আবহাওয়া খারাপ হচ্ছে। টানা বৃষ্টিপাত ও উত্তাল সাগরের কারণে ট্রলারগুলো বারবার ঘাটে ফিরে আসছে। প্রতিটি ট্রলারে লাখ লাখ টাকার বাজার-সদাই করে সাগরে পাঠাতে হয়। কখনো নিম্নচাপ, কখনো লঘুচাপ সব মিলিয়ে ট্রলার মালিকরা বড় ধরনের ক্ষতির মধ্যে রয়েছেন।
আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি আপাতত নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা কম। তবে এর প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত ও সাগর উত্তাল থাকার পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।
বারবার বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। সাগরে মাছ ধরতে না পারায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ ট্রলার, জ্বালানি, খাবার ও বাজার-সদাই বাবদ প্রতিবারই বড় অঙ্কের টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরতে না পারলে ঋণ ও দাদনের বোঝা আরও বাড়ছে।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের মাঝি আ. আজিজ বলেন, ‘সম্প্রতি শেষ হওয়া নিষেধাজ্ঞার পর এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখিনি। আমরা মাছ না পেলে আড়তদাররাও টাকা দিতে পারেন না। বাজার করে সাগরে নামার পর দু-একদিন মাছ ধরতেই আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। কোনো উপায় না পেয়ে আবার ঘাটে ফিরে আসতে হয়। দুই দিন আগে ৭ লাখ টাকার বাজার নিয়ে সাগরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসেছি মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টাকার মাছ নিয়ে।’
আলীপুর আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মামুন বলেন, ‘ইলিশের দাম চড়া থাকলেও বাজারে পর্যাপ্ত ইলিশের সরবরাহ নেই। বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে পারছেন না। এতে জেলেদের পাশাপাশি আড়তদাররাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছধরা ট্রলারগুলো সকাল থেকেই ঘাটে ফিরতে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্র বারবার উত্তাল হয়ে পড়ছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে জেলেরা আবারও সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারবেন।’
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply