1. news@gmail.com : news :

ওয়াসার জমি দখল করা সেই ব্যক্তিই হলেন চেয়ারম্যান!

  • Update Time : Monday, October 5, 2026

চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে আইনগত প্রশ্নের পাশাপাশি বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, ওয়াসা বোর্ডের সদস্যদের মধ্য থেকেই একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়া বিএনপি নেতা ইদ্রিস মিয়া বর্তমানে ওয়াসা বোর্ডের সদস্য নন। এ অবস্থায় তাঁর নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পানি সরবরাহ-৩ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে ইদ্রিস মিয়াকে চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. আকতারুন নেছা স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ৭(১) ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ওই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বলা হয়েছে, ওয়াসা বোর্ডে একজন চেয়ারম্যান থাকবেন এবং সরকার তাঁকে বোর্ডের সদস্যদের মধ্য থেকে নিয়োগ করবে। ইদ্রিস মিয়া ওয়াসা বোর্ডের সদস্য না হওয়ায় আইনটির সঙ্গে তাঁর নিয়োগের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আইনি বিধান অনুসরণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ইদ্রিস মিয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। এর আগে তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পটিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এদিকে ওয়াসার জমি বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ইদ্রিস মিয়ার বিরুদ্ধে। ওয়াসা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের মধ্য হালিশহরে পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে ৯৫৭ শতক বা ৯ দশমিক ৫৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, ওই জমির প্রায় ১০ একর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকা ঋণ নেয় মেসার্স আজমির ট্রেডিং। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইদ্রিস মিয়া। ঋণের অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখা বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

বিষয়টি ওয়াসার নজরে এলে একই বছরের ২৯ নভেম্বর সংস্থাটির তৎকালীন সচিব শারমিন আলম ব্যাংকটির খাতুনগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপককে চিঠি দেন। ওয়াসার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, একটি চক্র জাল দলিল তৈরি করে সংস্থাটির অধিগ্রহণ করা জমি আত্মসাতের চেষ্টা করছে।

ওয়াসার নথিপত্রে দেখা যায়, জমিটি নিয়ে এর আগেও সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। ২০০৬ ও ২০১১ সালে এ জমির বিষয়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল ওয়াসা। সংস্থাটির পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা ওই জমিতেই বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।

জমিটির মালিকানা নিয়ে বর্তমানে ওয়াসার সঙ্গে বিরোধও রয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম জানান, যে মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জমিটি অন্য ব্যক্তির বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই মামলার আদেশের বিরুদ্ধে ওয়াসার পক্ষ থেকে আপিল করা হয়েছে। তবে সেই আপিলের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

অন্যদিকে জমিটি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান ইদ্রিস মিয়া। তাঁর ভাষ্য, সালমা বেগমের সঙ্গে রেজিস্টার্ড বায়না করার পর জমিটি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছেন তিনি। পরে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে।

তবে ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম প্রশ্ন তুলেছেন, ওয়াসার অধিগ্রহণ করা জমি কীভাবে অন্য কারও মালিকানাধীন হতে পারে। তাঁর মতে, দীর্ঘদিন জমিটি পড়ে থাকার সুযোগ নিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারি খতিয়ান তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

ইদ্রিস মিয়াকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বিষয় হলো সাবেক ব্যবসায়ী সাইফুল আলম মাসুদ, যিনি এস আলম নামে পরিচিত, তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ। ইদ্রিস মিয়ার বাড়ি পটিয়ায়। পটিয়ায় এস আলমের ৮ কোটি টাকা অর্থায়নে নির্মিত আঞ্জুমানে ইত্তেহাদ নামের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তিনি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে জমি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেটিও একসময় এস আলমের মালিকানাধীন ছিল। এসব কারণে ইদ্রিস মিয়াকে এস আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে তাঁর নিয়োগের পর পুরোনো এসব বিষয়ও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পাওয়ার পরও ইদ্রিস মিয়া এখন পর্যন্ত ওয়াসায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন না। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘একটু ব্যস্ত আছি।’ ফলে আইনগত প্রশ্ন, ওয়াসার জমি নিয়ে বিরোধ, ২২ কোটি টাকার ঋণ এবং এস আলম-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ—সব মিলিয়ে তাঁর নিয়োগকে ঘিরে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন



সর্বশেষ :

প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It