1. news@gmail.com : news :

চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট : নিভেছে চুলা, কমেছে উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং

  • Update Time : Monday, August 3, 2026

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বাসাবাড়িতে বেশিরভাগ সময়ই চুলা জ্বলেছে না। একই অবস্থা শিল্প-কারখানাতেও; ফলে কমেছে উৎপাদন। অন্যদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকেরা। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে, ফলে বেড়েছে লোডশেডিং। সব মিলিয়ে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের জনজীবন, পরিবহন, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমে এসেছে স্থবিরতা।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামে গ্যাসের দৈনিক স্বাভাবিক চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। সংকটের শুরুতে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছিল মাত্র ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। কিন্তু আগস্টের শুরু থেকে সরবরাহ আরও কমে গেছে। ফলে আবাসিক ও শিল্প—সব খাতেই তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।

সংকটের কারণে নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, চকবাজার, বাকলিয়া, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় ভোরের পর থেকেই গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যে নেমে আসে। অনেক পরিবারে দুপুরের খাবার রান্না করতে হচ্ছে বিকেলে কিংবা গভীর রাতে। অনেকে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করছেন। একই চিত্র সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতেও। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য সিএনজিচালিত যানবাহনচালকদের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও গ্যাস না পেয়েই ফিরতে হচ্ছে অনেককে।

নগরীর আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা ইশরাত জাহান বলেন, এক সপ্তাহ ধরে পরিবারের খাবারের কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। সকালেই গ্যাস চলে যায়। দুপুরে রান্না করা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে রেস্তোরাঁ থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। বড়রা বাইরে খাবার খেলেও ছোট শিশুদের নিয়মিত হোটেলের খাবার খাওয়ানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকি।

মইজ্জার টেক এলাকার অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ ফরহাদ আলম বলেন, আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যেই গ্যাস নেওয়া যেত। এখন চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাওয়া যায় না। দিনের বেশির ভাগ সময় লাইনে কাটিয়ে দিলে যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হয় না। এতে মালিকের জমা তোলা এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাসের সংকটের বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানাসহ (সিইউএফএল) বিভিন্ন বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে উৎপাদন ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক কারখানায় নির্ধারিত সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন হচ্ছে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, ইস্পাত, টেক্সটাইল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে।

আবার, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। ফলে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি আবাসিক এলাকাতেও দিনে প্রায় সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনও স্বাভাবিক হবে না। এতে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে যেমন গ্যাসের অভাবে কারখানাগুলো উৎপাদন কমাচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে উৎপাদন কার্যক্রম আরও ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে চট্টগ্রামের শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। এতে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং উৎপাদন ব্যয়—সবকিছুই নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনগরী। এখানে গ্যাস সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাই শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

জানা যায়, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আগে যেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হতো, তা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। আবার, জাতীয় গ্রিডে সামগ্রিক গ্যাস ঘাটতি তৈরি হওয়ায় চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ হওয়ার কথা তার একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকার চাহিদা পূরণে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে স্থানীয় চাহিদা আরও অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে এবং গত কয়েক দিনে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস ডিভিশন) প্রকৌশলী মো. তাজউদ্দিন ঢালী বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সীমিত সরবরাহ রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। ১ আগস্ট দুপুরের পর থেকে আংশিক ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর বদলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। গ্যাসের প্রেসার ও ফ্লো কম থাকায় পরিস্থিতি বেগতিক হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি মেরামত করে পুনরায় চালু করতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে। ফলে টার্মিনালটি সচল না হওয়া এবং জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন



সর্বশেষ :
নিজস্ব বাড়ির স্বপ্ন পূরণে আইপিডিসি ও এসইএলের যৌথ উদ্যোগ বিকেএসপির বীমা দাবি পরিশোধ করলো ন্যাশনাল লাইফ বিহা’র নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির দায়িত্ব গ্রহণ ও জমকালো অভিষেক কর্মসংস্থান ব্যাংক জাতীয়তাবাদী কর্মচারী সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্বোধন Half Yearly Financial Statements (Un-audited) of Al-Arafah Islami Bank PLC. বাব-এল মান্দেবে নিরাপদে চলছে চীনা জাহাজ, বাকিদের অবরোধ আজকের স্বর্ণের দাম: ৩ আগস্ট ২০২৬ চট্টগ্রামে ভয়াবহ গ্যাস সংকট : নিভেছে চুলা, কমেছে উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং জুলাই মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২৮৬ কোটি মার্কিন ডলার বিক্রয় ও মুনাফায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিতে কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করলো ওয়ালটন

প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It