1. news@gmail.com : news :

ভারতে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ, সংকটে পাবনার হোসিয়ারিশিল্প

  • Update Time : Tuesday, July 21, 2026

পাবনা শহরের সাধুপাড়া মহল্লার হোসিয়ারি ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বড় একটি হোসিয়ারি কারখানা। সেখানে প্রায় ৪০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। পণ্য রপ্তানি করে ভালো আয়ও করছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে স্থলপথে ভারতে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিপাকে পড়েন তিনি। উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে একসময় কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। দেনার দায়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েন। কর্মহীন হয়ে পড়েন ৪০০ শ্রমিক।

আরিফ হোসেনের মতো একই সংকটে পড়েছেন পাবনার অসংখ্য হোসিয়ারি উদ্যোক্তা। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্যমতে, জেলার প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানায় লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ করতেন। রপ্তানি বন্ধের কারণে প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিক এখন বেকার। সংকটে পড়ে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের সভাপতি সেলিম সরদার বলেন, দেশের হোসিয়ারি পণ্যের ৬৫ শতাংশ পাবনা থেকে রপ্তানি হতো। প্রতিদিন পাওনাদারদের সঙ্গে মালিকদের বিরোধ হচ্ছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। শিল্পটিকে বাঁচাতে এবং মালিক-শ্রমিকদের রক্ষায় দ্রুত এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।

২০০ বছরের চড়াই-উতরাই

প্রবীণ হোসিয়ারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাবনায় এই শিল্পের গোড়াপত্তন প্রায় ২০০ বছর আগে। তখন শহরের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ইছামতী নদীপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো। তৎকালীন ধনাঢ্য হিন্দু ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে উন্নত মানের সুতা আমদানি করে এবং নিজেদের তৈরি সুতা দিয়ে গেঞ্জি উৎপাদন করতেন। উন্নত মানের সেই গেঞ্জি দ্রুতই দেশে-বিদেশে পরিচিতি পায়।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ওই ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ ভারতে চলে যান। এরপর শিল্পে ভাটা পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে শিল্পের নিয়ন্ত্রণ আসে মুসলমান ব্যবসায়ীদের হাতে। তাঁরা শিল্পটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শিল্পটি প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ১৯৯০ সালের দিকে সুতার গেঞ্জির পরিবর্তে তৈরি পোশাক কারখানার ঝুট কাপড়ের গেঞ্জি, শার্ট, প্যান্ট, সোয়েটারসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন শুরু হয়। ফলে শিল্পের পরিধি বাড়তে থাকে। ভারত ও মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হতে থাকে।

স্থলপথে রপ্তানি বন্ধের পর সংকট

কারখানামালিকেরা জানান, আগে ট্রাকযোগে স্থলপথে ভারতে হোসিয়ারি পণ্য রপ্তানি হতো। প্রতি সপ্তাহে শতাধিক ট্রাক পণ্য ভারতে যেত। এতে দেড় থেকে দুই লাখ মার্কিন ডলার আসত। স্থলপথ বন্ধ হওয়ার পর এখন সপ্তাহে মাত্র সাত–আট ট্রাক পণ্য নৌপথে পাঠানো হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পণ্য পাঠাতে একদিকে ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সময়ও বেশি লাগছে। আবার পণ্যের মূল্য পেতে এক মাসের বেশি সময় লাগছে। সব মিলিয়ে উদ্যোক্তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

পাবনা শহরতলির দ্বীপচরের হোসিয়ারি ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলাম ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে ঝুট কাপড় কিনে এনে গেঞ্জি, সোয়েটার, মোজাসহ বিভিন্ন পোশাক তৈরি করে ভারত, মালয়েশিয়া, কাতারসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতেন। তিনি জানান, তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের দুই-তৃতীয়াংশই ভারতে রপ্তানি হতো। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৫ লাখ টাকার পণ্য রপ্তানি হতো। শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছিল। রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পর এখন কোনো আয় নেই। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

সাধুপাড়া মহল্লার এসবি রয়েল গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক মো. আশিক হোসেন বলেন, ‘স্থলপথে রপ্তানি বন্ধের কারণে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আগে কাজের চাপে দম ফেলার সময় ছিল না। প্রায় ৩০ জন কর্মী শুধু কাটিংয়ের কাজ করতেন। এখন আছেন সাতজন। ফলে আমরা শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছি।’

সরেজমিনে একদিন

সম্প্রতি শহরের সাধুপাড়া, বাংলাবাজার, দিলালপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শহরের পাশাপাশি গ্রামের পাড়া-মহল্লাতেও গড়ে উঠেছে বড় বড় ঝুট কাপড়ভিত্তিক কারখানা। কোথাও কাপড় কাটা, কোথাও সেলাইয়ের কাজ চলছে। তবে আলাপকালে তাঁদের অধিকাংশের চোখেমুখেই উদ্বেগের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। কারখানাগুলোর গুদাম ও শোরুমে উৎপাদিত পণ্যের মজুত রয়েছে। বস্তায় ভরা ঝুট কাপড়ও পড়ে আছে। অধিকাংশ কারখানায় অর্ধেকের বেশি শ্রমিক নেই। যাঁরা আছেন, তাঁদের কাজেও আগের ব্যস্ততা নেই।

সাধুপাড়া ঝুটপল্লির ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের তৈরি পোশাক কারখানা থেকে ঝুট কাপড় কিনে এনে বিক্রি করেন। আগে কাপড় দিয়েও শেষ করতে পারতেন না। কিন্তু দেড় বছর ধরে তেমন বিক্রি নেই। গুদামভর্তি কাপড় নিয়ে বসে আছেন। আগে কাপড় বাছাইয়ে ১৫ জন কর্মী ছিলেন। কাজ না থাকায় ১০ জনকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।

একই এলাকার আরেক ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, তাঁরা কেউ ব্যাংক, কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন। দেশের চেয়ে বিদেশের বাজারে ব্যবসা ভালো চলছিল। ভারতের সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবাই বড় সংকটে পড়েছেন।

কাজ হারিয়েছেন অনেকে

আফজাল হোসেন নামের একজন শ্রমিক জানান, তিনি সাধুপাড়া মহল্লার একটি কারখানার কাজ হারিয়ে এখন অন্য কাজের খোঁজ করছেন।

জনি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান বলেন, স্থলপথে পণ্য রপ্তানিতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগত। পাঁচ দিনের মধ্যেই টাকা পাওয়া যেত। এখন নৌপথে পণ্য পাঠাতে সময় লাগছে ২০ থেকে ২৫ দিন। টাকা আসছে ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অল্প পরিমাণ পণ্য পাঠানো হচ্ছে। তাঁদের কয়েকটি কারখানায় আগে প্রায় ৫০০ শ্রমিক কাজ করতেন, যা কমে এখন ২০০ জন হয়েছে।

জেলার সবচেয়ে বড় হোসিয়ারি পণ্য বিক্রেতা এ আর কর্নারে উৎপাদিত পণ্যে বিভিন্ন নকশার ছাপ দেন তরুণ দাস। তিনি জানান, রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় কাজ প্রায় নেই। বেকার বসে দিন কাটছে। স্ত্রী অসুস্থ। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান বলেন, হোসিয়ারিশিল্প পাবনার ঐতিহ্য। এ শিল্প দিয়েই জেলার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। শিল্পটির ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এখন এটি চরম সংকটে পড়েছে। এই সংকট কাটাতে সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। শিল্প রক্ষায় দ্রুত আমদানি-রপ্তানির স্থলপথ খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সরকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন



সর্বশেষ :
সিএসই-৩০ ইনডেক্সে যুক্ত হলো ৪ নতুন কোম্পানি, বাদ পড়ল ৪টি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে ধাপে ধাপে প্রশাসক সরাবে বাংলাদেশ ব্যাংক যে কারণে ফের আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হলেন বদিউর রহমান বিএফটিআইকে শক্তিশালী থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী পুঁজিবাজারে প্রস্তাবিত মার্জিন বিধিমালাঃ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ, বাজারের স্থিতিশীলতা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সাউথইস্ট ব্যাংকের দ্বিতীয় প্রান্তিক প্রকাশ Notice of the 43rd AGM of National Bank PLC. ৫ দেশ থেকেই এলো ৬২% রেমিট্যান্স, সৌদির পর যুক্তরাজ্যের চমক সূচকের উত্থানে চলছে লেনদেন ভারতে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ, সংকটে পাবনার হোসিয়ারিশিল্প

প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It