সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। এজন্য আগামী বাজেটে নানামুখী নীতিসহায়তাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কার্পণ্য করতে চায় না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু যেভাবে রোডম্যাপ করার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন ততটা সহজ হবে না। এর অন্যতম চ্যালেঞ্জ অর্থের জোগান। তাছাড়া এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের যে টার্গেট দেওয়া হয়েছে তা প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে বিদ্যমান বাস্তবতায় অর্জন করা সম্ভব হবে না। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সরকার শেষ পর্যন্ত কতটুকু স্বস্তি ফেরাতে পারবে সেটি এখন দেখার বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী ধীরগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থবিরতা এবং শিল্প উৎপাদনে প্রতিযোগিতার চাপ সামনে রেখে পরিকল্পনা সাজিয়েছে সরকার। এজন্য বড় ধরনের কর সংস্কার ও প্রশাসনিক সহজীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প সুরক্ষা ও রাজস্ব সম্প্রসারণের একাধিক নীতিগত পরিবর্তন যুক্ত করা হয়েছে। সূত্র জানায়, বাজেট প্রস্তাবনায় কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে আনার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধ ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। অডিট নির্বাচন, কর মামলা নির্বাচন এবং উৎসে কর যাচাই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় করার মাধ্যমে কর ব্যবস্থাকে মানবনির্ভরতা থেকে প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিফান্ড সরাসরি ব্যাংক হিসাবে প্রদান এবং বছরজুড়ে রিটার্ন দাখিলের সুযোগও করদাতাদের জন্য নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসা সহজীকরণের অংশ হিসাবে অনুমোদনযোগ্য ব্যয়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে এবং আগের সেই বিধান বাতিল করা হয়েছে; যেখানে উৎসে কর কর্তন না থাকলে ব্যয় অগ্রহণযোগ্য হিসাবে গণ্য হতো। এতে করযোগ্য আয় কমে আসবে এবং করদায় তুলনামূলকভাবে হ্রাস পাবে। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা হলেও ভবিষ্যতে কর নেট সম্প্রসারণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামানোর পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
কর নেট সম্প্রসারণে খুচরা পর্যায়ে পণ্য সরবরাহের ওপর শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে, যা প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা হিসাবে গণ্য হবে এবং পরে সমন্বয়যোগ্য থাকবে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
উৎসে কর ও অগ্রিম কর কাঠামোয় বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস আনা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়েছে, জ্বালানি তেল সরবরাহে ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো হয়েছে। বিদেশি যন্ত্রপাতি ভাড়ায় উৎসে কর ১৫ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে, রি-ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়ামে ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে এবং বিদেশি ঋণের সুদে ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো হয়েছে।
শিল্প আমদানি খাতে অগ্রিম করও কমানো হয়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে ৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামে ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ এবং স্থানীয় মোবাইল উৎপাদনের কাঁচামালে সর্বোচ্চ ১ শতাংশে নামানো হয়েছে। পয়েন্ট অব সেলস মেশিনে অগ্রিম কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে শুল্ক কাঠামোয়। ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টার আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসএসডি আমদানিতে অন্যান্য শুল্ক তুলে দিয়ে শুধু ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। স্টার্টআপ খাতে স্থানীয় ও আমদানি সেবায় ভ্যাট প্রত্যাহার, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত করা এবং মোবাইল সিম ব্যবহারের ৩০০ টাকা কর বাতিলকে ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বড় সহায়ক হিসাবে দেখা হচ্ছে।
কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সহায়তায় স্টার্টআপ, নারী ও প্রতিবন্ধী উদ্যোক্তাদের জন্য টার্নওভার করমুক্ত সীমা বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায় টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশে নামানো হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয় সম্পূর্ণ করমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় আমদানিনির্ভর খাতে শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রিজ প্রুফ পেপার, মাইজ স্টার্চ, কপার টিউব, পিভিসি রেজিনসহ একাধিক কাঁচামালে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। হাউসহোল্ড ওয়াশিং মেশিন, কোল্ড রোল্ড কয়েল এবং কপার তারে অতিরিক্ত রেগুলেটরি ও সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এর বিপরীতে পোলট্রি, ডেইরি ও ফিশ ফিডশিল্পের কাঁচামালে শূন্য শুল্ক সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
পরিবহণ খাতে বড় ধরনের নীতি পরিবর্তন এসেছে। ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনে মোট করভার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনচালিত যানবাহনে মোট করভার ১৩২ শতাংশের বেশি থেকে ১৫৫ শতাংশের কাছাকাছি বাড়ানো হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে অর্থনীতিকে ধাবিত করার নীতি নির্দেশ করে।
বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ জিডিপির অনুপাতে ধারাবাহিকভাবে কমে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলা প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে এবং নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। নতুন উদ্যোগ অনুযায়ী ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের আবেদন সাত দিনের মধ্যে প্রভিশনাল অনুমোদন পাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স না দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত হিসাবে গণ্য হওয়ার বিধানও যুক্ত হচ্ছে। লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর নির্ধারণ এবং একক ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সব অনুমোদন ও লাইসেন্স এক জায়গায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে হয়রানি কমবে এবং ব্যবসা পরিচালনার সময় ও ব্যয় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply