পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বীমা খাতের কোম্পানি রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি পরিনত হয়েছে জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও কাগজের সম্পদে কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে লভ্যাংশ লোপাটসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ। মুলত রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক কেলেঙ্কারি ও নীতিহীনতার ব্যাপ্তি কেবল অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখানো বা ব্যাংক তহবিল গায়েবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কোম্পানিটির জালিয়াতির জাল আরও গভীরে বিস্তৃত, যার মধ্যে রয়েছে নবায়ন প্রিমিয়ামের হিসাবে ভয়াবহ কারচুপি, দেশের প্রচলিত বিমা আইন সম্পূর্ণরূপে লঙ্ঘন করে কোটি কোটি টাকার ব্যবস্থাপনা ব্যয় গোপন করা এবং দেউলিয়া ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রভিশন ছাড়াই গ্রাহকের আমানতের টাকা লগ্নি করা।
এ ধারাবাহিক অনিয়মের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ বিমা গ্রাহকদের, যাদের ভবিষ্যৎ পলিসির বোনাস ও জমাকৃত টাকা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। ফলে অস্তিত্বহীন সম্পদ ও ব্যাংক তহবিল উধাও এবং আইনি খরচ গোপনের মাধ্যমে গ্রাহকদের লাইফ ফান্ড এখন চরম ঝুঁকিতে। এমনকি রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন আর্থিক কারচুপির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক বিবরণী ও নিরীক্ষকদের গোপন প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিটি তাদের নথিপত্রে কোটি কোটি টাকার অলীক ও অস্তিত্বহীন সম্পদ দেখিয়ে গ্রাহক, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুকৌশলে প্রতারিত করে আসছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ পুঞ্জীভূত জালিয়াতির কারণে কোম্পানিটি এখন চরম দেউলিয়া পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা পুরো বিমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ দেখিয়েছে ৬১৮ কোটি টাকা। তবে নিরীক্ষক দল ও আর্থিক বিশ্লেষকদের চুলচেরা পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে এক নেপথ্য সত্য। এ প্রদর্শিত সম্পদের মধ্যে অন্তত ১২০ কোটি টাকার সম্পদের কোনো বাস্তব বা দৃশ্যমান অস্তিত্বই নেই। বিমা খাতের সুশাসন ও প্রচলিত হিসাববিজ্ঞান নীতিমালা অনুযায়ী, এ বিশাল অঙ্কের কাল্পনিক ও অস্তিত্বহীন সম্পদকে অবিলম্বে কোম্পানির ‘লাইফ ফান্ড’ বা জীবন তহবিল থেকে বাদ দেয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু রূপালী লাইফ কর্তৃপক্ষ তা করেনি, উল্টো এ অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকাকে লাইফ ফান্ডের অংশ হিসেবে ধরে ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত বা ‘সারপ্লাস’ প্রদর্শন করেছে।
শুধু কাগজের কলমে এ ভুয়া উদ্বৃত্ত দেখানোই শেষ নয়, এ কাল্পনিক মুনাফাকে ভিত্তি ধরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের জন্য ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশও ঘোষণা ও বিতরণ করেছে। অথচ বাস্তব হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক প্রতিবেদন থেকে যদি এ অস্তিত্বহীন ১২০ কোটি টাকার সম্পদকে লাইফ ফান্ড থেকে পুরোপুরি বাদ দেয়া হয়। তবে কোম্পানির প্রকৃত জীবন তহবিল কমে দাঁড়ায় মাত্র ৩৭৭ কোটি টাকায়। এ প্রকৃত ফান্ডের বিপরীতে যখন পলিসি গ্রাহকদের মোট দায় তথা ৪৭২ কোটি টাকাকে সমন্বয় করা হয়, তখন কোম্পানির উদ্বৃত্ত তো দূরের কথা, উল্টো ৯৮ কোটি টাকার এক বিশাল ও ভয়াবহ প্রকৃত আর্থিক ঘাটতি উন্মোচিত হয়।
হিসাববিদ ও বিমা বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্তিত্বহীন কাল্পনিক সম্পদ দেখিয়ে এভাবে কৃত্রিম উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস তৈরি করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আর্থিক অপরাধের শামিল। এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড একদিকে যেমন শেয়ারহোল্ডার ও সাধারণ পলিসিগ্রাহকের মৌলিক স্বার্থকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করে, অন্যদিকে কোম্পানির প্রকৃত নাজুক আর্থিক অবস্থাকে আড়াল করে রাখে। এর চূড়ান্ত পরিণতিতে কোম্পানির মূল তহবিল আকস্মিকভাবে সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আর্থিক প্রতিবেদনের অন্যতম বড় ধাক্কাটি এসেছে ব্যাংক জমার হিসাব থেকে। ২০২৪ সালের বার্ষিক আর্থিক নথিতে কোম্পানিটি দাবি করেছে যে, দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে তাদের মোট জমার পরিমাণ ৯১ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এ হিসাবের বিস্তারিত বিবরণীতে দেখানো হয়েছে, কোম্পানির বিভিন্ন এসটিডি (ঝঞউ) অ্যাকাউন্টে রয়েছে ৬৯ কোটি ৩ লাখ টাকা এবং চলতি হিসাবে জমা রয়েছে ২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
তবে নিরীক্ষক দল (অডিটর) যখন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এবং বাস্তব অনুসন্ধান চালায়, তখন বেরিয়ে আসে এক অবিশ্বাস্য জালিয়াতি। অডিটররা সরেজমিনে রূপালী লাইফের ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোতে মাত্র ৪৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। অর্থাৎ, নথিতে বর্ণিত হিসাবের চেয়ে বাকি ৪৪ কোটি টাকার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব, বৈধ রসিদ বা আইনি নথিপত্র নিরীক্ষকেরা খুঁজে পাননি। এ বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে স্রেফ উধাও হয়ে গেছে।
এ বিপুল আর্থিক গরমিল ও নথিপত্রের মারাত্মক ঘাটতির বিষয়টি নিরীক্ষক দল তাদের আনুষ্ঠানিক ‘কোয়ালিফাইড ওপিনিয়নে’ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়েও রূপালী লাইফের ব্যাংক জমার স্থিতি নিয়ে বারবার একই ধরনের গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু কোনো কার্যকর সমাধান বা ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
তহবিল তছরূপের আরও এক অভিনব হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ খাতকে। মাঠপর্যায়ে সাধারণ গ্রাহকেরা তাদের কষ্টার্জিত বিমা পলিসির প্রিমিয়ামের টাকা জমা দিয়েছিলেন রূপালী লাইফের অনুমোদিত এজেন্টদের কাছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের সে এজেন্টরা গ্রাহকের সে টাকা কোম্পানির কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা না দিয়ে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করেছেন। অথচ রূপালী লাইফ কর্তৃপক্ষ এ অনাদায়ী ও বকেয়া অর্থকে বছরের পর বছর ধরে তাদের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ বা কোম্পানির কার্যকর সম্পদ হিসেবে প্রদর্শন করে আসছে।
সবচেয়ে বড় অনিয়মটি ঘটেছে এখানেই। এজেন্টদের হাতে আটকে থাকা বা হারিয়ে যাওয়া এ অনাদায়ী টাকাকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে রূপালী লাইফের পরিচালকেরা কৃত্রিম সারপ্লাস দেখিয়েছেন। সেই সারপ্লাসের ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত মোটা অঙ্কের লভ্যাংশ নিজেদের পকেটে পুরেছেন।
২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত ৭ বছরের আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ ‘এজেন্ট ব্যালান্স’ খাতে মোট ২৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালে ৭ কোটি ৭২ লাখ, ২০১৮ সালে ৪ কোটি ৯৮ লাখ, ২০১৯ সালে ৪ কোটি ৪৬ লাখ, ২০২০ সালে ৩ কোটি ৬৯ লাখ এবং ২০২১ সালে ৪ কোটি ৮ লাখ টাকার বকেয়া সম্পদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী অর্থ আদায় না হওয়া সত্ত্বেও তা দিয়ে মুনাফা দেখানো স্পষ্ট জালিয়াতি।
কোম্পানির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও শাখাগুলোতে নগদ কত টাকা গচ্ছিত রয়েছে, তা নির্দেশ করে ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ বা হাতে নগদ খাত। রূপালী লাইফের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এ খাতে মাত্র ৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ছিল। এরপর থেকে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই প্রতি বছর এ খাতের অঙ্ক অবাস্তবভাবে বাড়তে থাকে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ক্যাশ ইন হ্যান্ডের পরিমাণ দেখানো হয়েছে বিশাল অঙ্কের- ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
বিমা খাতের সিনিয়র চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও হিসাববিদদের মতে, এ বিপুল পরিমাণ টাকা অলসভাবে কোম্পানির অফিসে বা কারো হাতে নগদ রেখে দেয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা নেই। এত কোটি কোটি টাকা কোনো লাভজনক খাতে বিনিয়োগ না করে হাতে নগদ হিসেবে দেখানোর পেছনে বড় ধরনের জালিয়াতি লুকিয়ে রয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদনে এ ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকা আদতে কার কাছে, কোন সিন্দুকে বা কার জিম্মায় রয়েছে, তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ বা ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের তীব্র আশঙ্কা, কোম্পানিটির মূল তহবিল থেকে বড় অঙ্কের অর্থ অন্য কোনো বেনামী খাতে সরিয়ে নিতে বা সরাসরি আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে এ ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ খাতের ভুয়া অঙ্ক ব্যবহার করা হয়েছে। এ জালিয়াতি বন্ধ না হলে সাধারণ গ্রাহকের জমানো টাকা ফেরত পাওয়া আগামী দিনে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
২৮ কোটি ভুয়া আয়, ৩২ কোটি গোপন ব্যয়: বিমা খাতের নিয়ম অনুযায়ী, লাইফ বিমা কোম্পানিগুলো ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে তাদের অর্থবছর ধরে আয়-ব্যয়ের হিসাব করে। তবে সমাপনী হিসাবের সুবিধার্থে জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সময়কে অনুগ্রহকাল ধরে এ সময়ে আদায়কৃত নবায়ন প্রিমিয়ামকে ‘আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম’বা সম্ভাব্য আয় হিসেবে বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখানোর সুযোগ রয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে ডিসেম্বর মাসের সমাপনী হিসাবের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।
২০২৪ সালে রূপালী লাইফ মোট নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ দেখায় ১৪৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে মোট ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকাই দেখানো হয়েছে ‘আউটস্ট্যান্ডিং প্রিমিয়াম’ হিসেবে, যা তাদের মোট নবায়ন প্রিমিয়ামের ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ, কোম্পানিটি দাবি করেছে যে তাদের মোট প্রিমিয়ামের অর্ধেকেরও বেশি টাকা আসবে কেবল জানুয়ারি মাসের অনুগ্রহকালে। এ অস্বাভাবিক দাবির চরম অসাড়তা প্রমাণিত হয়েছে বছর শেষে প্রিমিয়াম আদায়ের বাস্তব চিত্রে। এ আউটস্ট্যান্ডিং দেখানো ৭৪ কোটি ১৯ লাখ টাকার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে আদায় হয়েছে মাত্র ৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা (৬২ শতাংশ)।
বাকি ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা কখনোই আদায় বা কোম্পানির তহবিলে জমা হয়নি। কিন্তু রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কর্তৃপক্ষ এ অনাদায়ী ও অস্তিত্বহীন ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকাকেই বৈধ আয় হিসেবে গণ্য করে তাদের লাইফ ফান্ড ও সারপ্লাসের হিসাব চূড়ান্ত করেছে। গড়ে ১০ শতাংশ নবায়ন কমিশন বাদ দিয়ে হিসাব করলেও, এ অনাদায়ী টাকা বাদ দিলে কোম্পানির ২২ কোটি ১৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্তের পরিবর্তে উল্টো ৩ কোটি টাকা প্রকৃত ঘাটতি থাকে। কিন্তু রূপালী লাইফের পরিচালকেরা এ ভুয়া আয়ের ওপর ভিত্তি করে ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ পকেটে পুরেছেন।
বিমা খাতের সুশাসন ও খরচের লাগাম টানতে প্রণীত বিমা আইন ২০১০-এর ৬২(২) ধারায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করার সময় মূলধনজনিত ব্যয়ের (ঈধঢ়রঃধষ ঊীঢ়বহফরঃঁৎব) যথার্থ অংশ অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ মূলধনজনিত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে স্থায়ী সম্পদের অবচয় (উবঢ়ৎবপরধঃরড়হ), ফেয়ার ভ্যালু সমন্বয় এবং শেয়ার কেনাবেচা সংক্রান্ত বিভিন্ন লোকসান। রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স এ আইনি বাধ্যবাধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মূলধনজনিত ব্যয় পুরোপুরি বাদ দিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হিসাব তৈরি করেছে। এতে ব্যয়ের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র আড়াল করা হয়।
২০১৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ বছরে রূপালী লাইফ তাদের মোট ব্যবস্থাপনা ব্যয় দেখিয়েছে ৭৭৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। কিন্তু যদি আইনের নিয়ম মেনে মূলধনায়িত ব্যয় যুক্ত করে প্রকৃত ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসাব করা হতো, তবে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াত ৮০৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ, সুকৌশলে আইনি নিয়ম লঙ্ঘন করে কোম্পানিটি তাদের ৩২ কোটি টাকার ব্যবস্থাপনা ব্যয় গোপন করেছে।
শুধুমাত্র ২০২৪ সালেই কোম্পানিটি ৩ কোটি ২২ লাখ টাকার মূলধনজনিত ব্যয় হিসাবের বাইরে রেখে বেআইনিভাবে দেখিয়েছে যে, তারা ওই বছর সরকার অনুমোদিত খরচের সীমার চেয়ে ৪৮ লাখ টাকা কম ব্যয় করেছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিটির অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত খরচের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করা হয়েছে।
গ্রাহকদের আমানতের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক হিসাব মান-আইএএস-৯ অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়লে বা আদায়ের অনিশ্চয়তা দেখা দিলে তার বিপরীতে বাধ্যতামূলকভাবে প্রভিশন বা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়।
কিন্তু রূপালী লাইফ দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক সংকট ও দেউলিয়াত্বের ঝুঁকিতে থাকা ৪টি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ৪টি চরম দুর্বল ব্যাংকে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছে। এ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ডুবন্ত বিনিয়োগের সম্পূর্ণ বিবরণী নিচের ব্যানার চিত্রে প্রকাশ করা হলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যেই ইন্টারন্যাশনাল লিজিং এবং পিপলস লিজিং বন্ধ করে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান দুটিতে রূপালী লাইফের ২ কোটি ৬০ লাখ ২৪ হাজার টাকা আটকে আছে। প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ হলে কোম্পানিটি সর্বোচ্চ মাত্র ২০ লাখ টাকা ফেরত পেতে পারে, অর্থাৎ বাকি ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা সম্পূর্ণ ডুবে গেছে। এছাড়া মাঠকর্মী ও কর্মকর্তাদের কাছে বকেয়া বা সমন্বয়হীন রয়েছে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। অগ্রিম বেতন-ভাতা, মোটরসাইকেল ও মোবাইল ক্রয়ের নামে দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকলেও তা উদ্ধারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কোম্পানিটি তাদের আর্থিক প্রতিবেদনে নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ ব্যয়ের হার বাস্তবের তুলনায় অনেক কম দেখিয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নবায়ন খরচ দেখানো হয়েছে গড়ে ৭.০৪ শতাংশ (সর্বনিন্ম ৬.০৮ থেকে সর্বোচ্চ ১০.২২ শতাংশ)। অথচ প্রকৃতপক্ষে নবায়ন প্রিমিয়ামের জন্য ব্যয়ের প্রকৃত হার গড়ে ১৪.৯০ শতাংশ (সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ)। এ ব্যয়ের হার গড়ে ৭.৮৫ শতাংশ কম দেখিয়ে আর্থিক বিবরণীতে জালিয়াতি করা হয়েছে। একইভাবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ৮ বছরে কোম্পানিটি মোট ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা নিট লোকসান করেছে। এ বিশাল ক্ষতি আড়াল করতে মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও অন্যান্য খাতের ডিভিডেন্ডের সঙ্গে তা সুকৌশলে সমন্বয় করে আর্থিক প্রতিবেদনে লোকসান গোপন করা হয়েছে।
এ ধারাবাহিক লুটপাট, ভুয়া হিসাব এবং অদক্ষ বিনিয়োগের চূড়ান্ত মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের। ২০২২ সালের পর থেকে রূপালী লাইফের লাইফ ফান্ড ক্রমাগত কমছে, অথচ গ্রাহকদের প্রতি কোম্পানির আর্থিক দায় বেড়েই চলেছে। ২০২২ সালে যেখানে কোম্পানির মোট লাইফ ফান্ড ছিল ৫০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়।
গত দুই বছরে কোম্পানির মোট বিনিয়োগ ২৮৫ কোটি ৩ লাখ টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের চেয়ে ২৪ কোটি ৯ লাখ টাকা (৭.৭৯%) সংকুচিত হয়েছে। তহবিল এভাবে ধসে পড়ার কারণে রূপালী লাইফ তাদের পলিসি বোনাসের হার প্রতি হাজার টাকায় ৫৫ টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৪৫ টাকায় এনেছে। যথাযথ তদারকি ও কঠোর আইনি শাস্তির ব্যবস্থা না করা হলে সাধারণ বিমা গ্রাহকদের এ কষ্টার্জিত আমানত অচিরেই কর্পূরের মতো উবে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply