শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতা ও ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। শুধু অনুমোদিত ২ শতাংশ বাদ দেওয়ার পরও সিস্টেম লসের কারণে কোম্পানিটির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৪২১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ ক্ষতি ৩৪ শতাংশ বেশি।
নিয়মিত মুনাফা ও ভালো লভ্যাংশ দিয়ে আসা তিতাস গ্যাস ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে লোকসানে রয়েছে। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত মোট লোকসান হয়েছে ১ হাজার ৬৮১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে লোকসান হয়েছে আরও ৬১৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ৯৮৯ কোটি ২২ লাখ টাকা। এর ৭৫ শতাংশ সরকারের এবং ২৫ শতাংশ শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মালিকানায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন উৎস থেকে তিতাস ১৫ হাজার ১৫৪ মিলিয়ন ঘনমিটার (এমএমসিএম) গ্যাস গ্রহণ করলেও বিক্রি করেছে ১৩ হাজার ৭১৮ এমএমসিএম। এতে বিক্রিত পণ্যের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
নিরীক্ষায় সিস্টেম লসের কারণ হিসেবে অবৈধ সংযোগ, পুরোনো ও ক্ষয়প্রাপ্ত বিতরণ লাইন, ভূগর্ভস্থ কাজের কারণে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের প্রকৃত ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য না থাকা, গ্যাস মাপার ব্যবস্থার পার্থক্য এবং লিকেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আয়কর দাবি ৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকা
২০১৫-১৬ থেকে ২০২৪-২৫ করবর্ষ পর্যন্ত তিতাসের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয়কর দাবি ৫ হাজার ৫৪ কোটি ৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত কোম্পানি ২ হাজার ১৯৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা প্রভিশন রেখেছে। এসব দাবির বিরুদ্ধে আপিল করা হলেও ফলাফল জানা যায়নি।
দুর্বল ব্যাংকে ১১১ কোটি টাকার এফডিআর
পদ্মা ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে তিতাসের ১১১ কোটি ২৯ লাখ টাকার মেয়াদি আমানত দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ। আইএফআরএস ৯ অনুযায়ী এসব অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতির জন্য প্রভিশন রাখার প্রয়োজন হলেও তা করা হয়নি।
৪৭০ কোটি টাকা পাওনা, আদায় নিয়ে শঙ্কা
বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইজিসিবিএল) কাছ থেকে ১৯৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছ থেকে মিটার ভাড়া, সেবা ও ডিমান্ড চার্জ বাবদ ২৭৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা পাওনা দেখিয়েছে তিতাস। মোট ৪৭০ কোটি ২৯ লাখ টাকা পাওনা থাকলেও কোনো অর্থ আদায় হয়নি। দীর্ঘদিন অনাদায়ী থাকায় এসব অর্থ আদায় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে জানিয়েছেন নিরীক্ষকেরা।
এদিকে, ইজিসিবিএলের কাছে তিতাসের হিসাবে পাওনা ২ হাজার ৯৪৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা হলেও ইজিসিবিএলের হিসাবে তা ২ হাজার ৮৪১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। পার্থক্য ১০২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। মেঘনা সুগার রিফাইনারির ক্ষেত্রে তিতাসের হিসাবে পাওনা ৯০ কোটি ৮১ লাখ টাকা, বিপরীতে প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ২৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে মোট ১৬৯ কোটি ১৫ লাখ টাকার পার্থক্যের সমন্বয় করা হয়নি।
মজুদ পণ্য ৩৬ কোটি টাকা বেশি
৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত তিতাসের মজুদ পণ্যের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৫৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা। নিরীক্ষায় ৩১ কোটি ৩৭ লাখ টাকার ডেড স্টক এবং ৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার অবসোলেট স্টক শনাক্ত হয়েছে। ফলে আইএএস ২-এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণভাবে মজুদ ৩৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে।
পেনশন তহবিলে ঘাটতি ৭৩২ কোটি টাকা
২০২০ সালের অ্যাকচুয়ারিয়াল মূল্যায়নে পেনশন তহবিলে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ছিল ১ হাজার ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, বিপরীতে সম্পদ ছিল মাত্র ৯২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মধ্যে ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা থাকলেও কোম্পানি প্রভিশন রেখেছে ৩৬০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি রয়েছে ৭৩২ কোটি ৬ লাখ টাকা।
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থায় দুর্বলতা
নিরীক্ষায় বোর্ড অনুমোদিত আইটি নীতিমালা না থাকা, পুরোনো সফটওয়্যার মডিউল ব্যবহার, অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যারে দায়িত্ব ও ক্ষমতার কাঠামো না থাকা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ অরাকল ১২সি ডেটাবেজ ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। সাইবার নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় লগ ব্যবস্থাপনা এবং আইটি দুর্যোগ পুনরুদ্ধার মহড়াও নেই। এতে আর্থিক তথ্যের পূর্ণতা, নির্ভুলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন নিরীক্ষকেরা।
এসব বিষয়ে তিতাস গ্যাসের সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মো. লুৎফুল হায়দার মাসুম বলেন, সিস্টেম লস কমাতে কেন্দ্রীয়ভাবে কাজ করা হচ্ছে। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এ ক্ষেত্রে উন্নতি হয়নি।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply