1. news@gmail.com : news :

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে যে ‘রক্তসূত্র’

  • Update Time : Sunday, June 28, 2026

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। তবে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো তার মায়ের পরিচয়। ক্ষমতায় আসার ১৫ বছরেও তিনি কখনো প্রকাশ্যে নিজের মায়ের নাম উচ্চারণ করেননি।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে উত্তর কোরিয়ার শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ‘পেকতু রক্তধারা’ (মাউন্ট পেকতু ব্লাডলাইন) নিয়ে গভীর রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা। কারণ কিম জং উনের মাতৃপরিচয় প্রকাশ্যে এলে তা দেশটির বংশানুক্রমিক শাসনের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

পেকতু পর্বতের পৌরাণিক গুরুত্ব

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার লোককথা অনুযায়ী, চীন-উত্তর কোরিয়া সীমান্তের পেকতু পর্বতেই জন্ম হয়েছিল কোরীয় জাতির পৌরাণিক প্রতিষ্ঠাতা দানগুনের। পরে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল সুংও জাপানবিরোধী লড়াইয়ের সময় এই পর্বতকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রচার করা হয়।

রাষ্ট্রীয় বর্ণনায় বলা হয়, কিম জং ইলও পেকতু পর্বতেই জন্মেছিলেন, যদিও বহু গবেষক মনে করেন তিনি বাস্তবে রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তারপরও কয়েক দশক ধরে এই পেকতু রক্তধারাকে কেন্দ্র করেই কিম পরিবার তাদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে আসছে।

নির্বাসিত উত্তর কোরীয় কূটনীতিক রিউ হিউন-উ তার ‘কিম জং উন’স সিক্রেট ভল্ট’ বইয়ে লিখেছেন, ‘কিম জং উন মাত্র বিশের কোঠায় উত্তরাধিকারী হন, কোনো ব্যক্তিগত কৃতিত্বের কারণে নয় বরং শুধুমাত্র পেকতু রক্তধারার কারণে।’

কিন্তু কিমের মাতৃপরিচয় সেই প্রচলিত বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

ছবিতে কিম জং উনের মা কো ইয়ং

জাপানে জন্ম, দক্ষিণ কোরীয় শিকড়

কিম জং উনের মা কো ইয়ং হুই ১৯৫২ সালে জাপানের ওসাকায় জন্মগ্রহণ করেন বলে বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। তার বাবা-মা মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন। তারা ছিলেন ‘জাইনিচি কোরিয়ান’ (জাপানের উপনিবেশিক শাসনামলে সেখানে বসবাস শুরু করা কোরীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর অংশ)।

পরে কো ইয়ং হুইয়ের বয়স যখন প্রায় ১০ বছর, তখন পরিবারসহ তারা উত্তর কোরিয়ায় চলে যান। ১৯৫৯ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে জাপান থেকে প্রায় ৯৩ হাজার কোরীয় বংশোদ্ভূত মানুষ উত্তর কোরিয়ায় পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় গিয়েছিলেন।

শুরুতে তাদের সমৃদ্ধ জীবনযাপনের কারণে ঈর্ষার চোখে দেখা হলেও পরবর্তীতে ‘জ্জায়েপো’ নামে অবজ্ঞাসূচক পরিচয়ে ডাকা হতো। উত্তর কোরিয়ার কঠোর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস ‘সংবুন’-এ তাদের অবস্থান ছিল সন্দেহভাজন ও নিম্নস্তরের নাগরিকদের কাতারে।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘পবিত্র’ পেকতু রক্তধারার বিপরীতে কিম জং উনের মায়ের এই পরিচয় রাষ্ট্রীয় বর্ণনার জন্য বড় ধরনের অস্বস্তির কারণ।

নর্দার্ন রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের গবেষক কিম হিউং সু বলেন, পেকতু রক্তধারাকে উত্তর কোরিয়ায় পবিত্র হিসেবে দেখা হয়। তাই একজন জ্জায়েপোর ছেলে দেশের নেতা; এই ধারণাই সেখানে অকল্পনীয়।

কিম জং ইল ও কো ইয়ং হুই

নৃত্যশিল্পী থেকে ক্ষমতার কেন্দ্র

কো ইয়ং হুই উত্তর কোরিয়ার বিখ্যাত মানসুদে আর্ট ট্রুপের সদস্য ছিলেন। সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় কিম জং ইলের। সে সময় কিম জং ইলের একজন আনুষ্ঠানিক স্ত্রী ছিলেন; নাম কিম ইয়ং সুক। এছাড়া আরও কয়েকজন উপপত্নীও ছিল তার। তবে জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমির ভাষ্য অনুযায়ী, কো ইয়ং হুইয়ের সৌন্দর্য ও নাচের দক্ষতায় মুগ্ধ হন কিম জং ইল।

তাদের ঘরে তিন সন্তানের জন্ম হয়, যার মধ্যে একজন ছিলেন বর্তমান নেতা কিম জং উন।

তবে বিয়ের বাইরে সন্তান জন্ম উত্তর কোরিয়ায় সামাজিকভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখা হয়। ফলে কিম জং উন ও তার পরিবারকে রাজধানী পিয়ংইয়ং থেকে দূরে উপকূলীয় শহর ওনসানে রাখা হয়েছিল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কো ইয়ং হুই কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে কিম পরিবারের পুত্রবধূ হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।

গোপন ফার্স্ট লেডি

কিম ইল সুংয়ের মৃত্যুর পর কিম জং ইল ক্ষমতায় এলে কো ইয়ং হুই কার্যত দেশটির অনানুষ্ঠানিক ফার্স্ট লেডিতে পরিণত হন। তিনি বিভিন্ন সামরিক সফরে কিম জং ইলের সঙ্গে থাকতেন এবং নীতিনির্ধারণেও প্রভাব রাখতেন বলে দাবি করেছেন পরিবারটির সাবেক রাঁধুনি ফুজিমোতো।

২০১১ সালে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে কো ইয়ং হুইকে কিম জং ইলের সঙ্গে দেখা গেলেও সেখানে তার নাম উল্লেখ করা হয়নি। পরে সেই ভিডিও সীমিত পর্যায়ে প্রচার করা হলেও দ্রুত তা প্রত্যাহার করে নেয় সরকার।

বিশ্লেষকদের মতে, তার পটভূমি সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়ার আশঙ্কাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

২০০৪ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান কো ইয়ং হুই। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তার মৃত্যুর খবরও প্রকাশ করা হয়নি।

মা কো ইয়ং হুইয়ের সঙ্গে ছোট্ট কিম জং উন

কীভাবে উত্তরাধিকারী হলেন কিম জং উন

কিম জং ইলের একাধিক সন্তানের মধ্যে কিম জং উন ছিলেন সবচেয়ে ছোটদের একজন। তার সৎভাই কিম জং নামকে একসময় সম্ভাব্য উত্তরসূরি ভাবা হলেও তিনি সংস্কারপন্থী মনোভাব ও বিলাসী জীবনযাপনের কারণে ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়েন। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগে নিহত হন কিম জং নাম।

অন্যদিকে বড় ভাই কিম জং চুল মাদকাসক্তির কারণে উত্তরাধিকার থেকে বাদ পড়েন বলে দাবি করেছেন সাবেক কূটনীতিক রিউ।

ফলে কো ইয়ং হুই নিজের ছেলে কিম জং উনকে উত্তরসূরি করার চেষ্টা চালান। বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্বের গুণাবলি ও প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাবার আস্থাও অর্জন করেন কিম জং উন। ২০১১ সালে কিম জং ইলের মৃত্যুর পর মাত্র ২৭ বছর বয়সে ক্ষমতায় বসেন তিনি।

এখনও কেন গোপন মায়ের পরিচয়?

বিশ্লেষকদের মতে, কিম জং উনের জন্মদিনকে জাতীয় ছুটি ঘোষণা না করার পেছনেও রয়েছে তার মাতৃপরিচয় নিয়ে সংবেদনশীলতা। কারণ, জন্ম ও বেড়ে ওঠার প্রসঙ্গ সামনে এলে মায়ের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। একই কারণে তিনি নিজের স্ত্রী রি সল জু ও মেয়ে জু অ্যেকে দ্রুত জনসমক্ষে এনেছেন বলেও ধারণা করা হয়। কারণ রি সল জু উচ্চবিত্ত ও রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পরিবারের সদস্য বলে বিবেচিত।

জাপানি সাংবাদিক ইয়োজি গোমি বলেন, মায়ের পটভূমি নিয়ে যে বৈধতার সংকট কিম জং উন অনুভব করেন, সেটিই সম্ভবত তাকে নিজের পরিবারকে দ্রুত প্রকাশ্যে আনতে প্রভাবিত করেছে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যদি কখনো উত্তর কোরিয়ার জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে কিম জং উনের মা জাপানে জন্ম নেওয়া কোরীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন, তাহলে তা দেশটির বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে।

নির্বাসিত কূটনীতিক রিউ হিউন-উর বলেন, এটি উত্তর কোরীয় সমাজে পারমাণবিক বোমার মতো প্রভাব ফেলতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন



সর্বশেষ :
ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন পরিদর্শন করলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এভিয়েশন.কম.বিডি’র উদ্যোগে ‘ট্যুর গাইড টেকনিক অ্যান্ড অপারেশন’ বিষয়ক দ্বিতীয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বে এনসিটি ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সিজন-২৪: ওয়ালটনের আয়োজনে তাসকিন ও মিমের সঙ্গে স্মরণীয় মুহূর্ত কাটালেন ২৪ ক্রেতা সাউথইস্ট ব্যাংকের গুলশান শাখা নতুন ঠিকানায় স্থানান্তরিত বিপিজির নতুন সভাপতি মোহাম্মদ ইউনূস উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে যে ‘রক্তসূত্র’ এমটিবির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে একেএম তারেকের যোগদান মাদক বিরোধী কর্মকাণ্ডে পপুলার লাইফের প্রথম পুরস্কার অর্জন ২৮ জুন ২০২৬: ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কত?

প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It