পরীক্ষাসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির পর জবাবদিহি ও শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতে নতুন মোড় নিয়েছে। বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আন্দোলন এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, বুধবার (২২ জুলাই) রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে অনলাইনভিত্তিক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর ডাকে হাজারো সমর্থকের সমাবেশ হয়। আন্দোলনকারীরা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, “ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা যন্তর মন্তর ছাড়ব না।” তিনি আরও বলেন, “যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, আমরা এখন সেই দেশকে জাগিয়ে তুলেছি।”
২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদি পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর তার সরকারের জন্য এটি অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। মূলত তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন মঙ্গলবার বিরোধী দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার পর আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী পুলিশের দমন-পীড়নের জন্য সরকারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। মঙ্গলবার তাকে প্রতিবাদস্থল থেকে আটক করে দুই ঘণ্টা পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়। বুধবার তিনি কালো পোশাক পরে পার্লামেন্টে উপস্থিত হয়ে সরকারের জবাবদিহি দাবি করেন।
সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেন, “ভারতের প্রত্যেক তরুণের ওপর প্রভাব ফেলছে এমন একটি বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি নীরব রয়েছেন।”
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সুর্য কান্তের এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। এক মামলার শুনানিতে তিনি তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) ও ‘পরজীবী’ বলে উল্লেখ করলে তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর প্রতিবাদেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে বেকারত্ব, কর্মসংস্থান সংকট এবং সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগও আন্দোলনের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়।
সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং পাথর নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটিকে দিল্লির সবচেয়ে বড় ছাত্র-তরুণদের বিক্ষোভ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার শর্ত পূরণ করেছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগে দায়ের করা একটি আবেদন শুনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
২০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী কাব্য এএফপিকে বলেন, “আমি ভীত। কারণ সোমবার পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের মারধর করতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অন্যান্য পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের পর এ আন্দোলনের সূচনা হয়। এসব ঘটনায় ২০ লাখের বেশি পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থীর অংশ নেওয়া একটি হাইস্কুল পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়ন নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেছেন, সরকার সংস্কার এবং এ বিষয়ে পার্লামেন্টে আলোচনার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লেখেন, “শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের জবাব, সংস্কার এবং জবাবদিহি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারা বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিশ্চয়তা, স্লোগানের চেয়ে সমাধান এবং বিঘ্নের চেয়ে দায়িত্বশীলতা পাওয়ার যোগ্য।”
দিল্লির বাইরে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াসহ বিভিন্ন শহরেও সিজেপির সমর্থনে হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply