দেশের বীমা খাতে তীব্র আস্থার সংকট, সুশাসনের অভাব এবং ডিজিটালাইজেশনের অনুপস্থিতির কারণে এই খাতটি কাঙ্ক্ষিত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, এ খাতের আস্থার সংকট ও লুটপাট দূর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত ১৭ বছরে ব্যাংক, পুঁজিবাজার ও বীমাসহ গোটা আর্থিক খাতের রেগুলেটরি বডিগুলোর ওপর মানুষের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার কোনো ‘ওভার-রেগুলেশন’ বা অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দিতে চায় না, কারণ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ চুরিকে সহায়তা করে। তবে গ্রাহকের অধিকার ও ন্যায্যতার স্বার্থে একটি শক্তিশালী ও জবাবদিহিতামূলক রেগুলেটরি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
শনিবার (২৭ মে) রাজধানীর বিজয়নগরের হোটেল একাত্তরে ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে বীমা খাতের সার্বিক উন্নয়নে ৫টি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ ও দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন:
লুটপাট বন্ধ ও মালিকানার মিথ ভাঙা:
বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকরা আসলে প্রকৃত মালিক নন, অথচ তাদের কারণে অনেক কোম্পানির অবস্থা আজ খারাপ এবং লুটপাট হয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
পণ্যের বৈচিত্র্যকরণ ও কৃষি বীমার বিস্তার:
বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে কৃষি বীমার ভূমিকা অত্যন্ত দুর্বল। কোম্পানিগুলো শুধু লাভের পেছনে না ছুটে জলবায়ু ও কৃষকদের সুরক্ষায় ইনোভেশন বা নতুন পণ্য নিয়ে আসবে। উচ্চবিত্ত বা নির্দিষ্ট চাকুরিজীবীর গণ্ডি পেরিয়ে স্বাস্থ্য বীমাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে।
গ্রাহক অধিকার রক্ষায় ডিজিটালাইজেশন:
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় বীমা খাতে অপচয় বাড়ছে এবং তা দুর্নীতি বা বিশেষ কাউকে সুবিধা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গ্রাহকের অধিকার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন প্রয়োজন।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জীবন সুরক্ষা:
মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যানবাহনে চলাচল করছে। কিন্তু বীমার মূল কাজ যেখানে ঝুঁকি গ্রাস করা, সেখানে আমাদের দেশের যানবাহন খাতে কার্যকর বীমা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
মার্কেট-বেজড রেগুলেশন ও ফাইন লাইন:
রেগুলেটরি বডিকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তবে তা যেন ওভার-রেগুলেশন না হয়। অডিটর, সার্ভেয়ার, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ও কনজিউমার রেটিং এজেন্সির মতো বাজার-ভিত্তিক উপাদানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এক সময়ের বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনসের বীমা খাত নিয়ে কাজের অনুপ্রেরণায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলেন, “আমি দেখেছি বীমা খাতের দুটি বড় রোগ—এক, এদের কোনো অ্যাসেট বা সম্পদ নেই; দুই, কোনো ইনভেস্টমেন্ট ডিপার্টমেন্ট নেই। লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অবস্থা তো আরও করুণ। এই খাতে এখন ন্যায্যতার এবং অধিকারের বড় অভাব।” তিনি আশ্বস্ত করেন, এই সেমিনার থেকে আসা যৌক্তিক সুপারিশগুলো সরকারের নীতি কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
আইআরএফ সভাপতি গোলাম মওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন জেনিথ ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের এমডি এসএম নুরুজ্জামান।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক বাণিজ্য প্রতিদিনের সম্পাদক ও আইআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।
এসময় বক্তারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বীমা খাতের আধুনিকায়ন এবং গ্রাহকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ওপর জোর দেন।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply