গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে (এফবিসিসিআই) ব্যবসায়ী নেতৃত্বের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রায় ২০ মাস ধরে ব্যবসায়ী নেতৃত্বের এই সংকটকে সাথে নিয়েই এখন সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়োগপ্রাপ্ত একজন প্রশাসকের মাধ্যমে। এতে নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ চললেও, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি সুদহার, কর ও ভ্যাটের চাপ, এবং বৈশ্বিক অস্থিরতায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের মতো জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ও দাবিদাওয়া তুলে ধরার মতো কার্যকর কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই।
বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধন না হওয়ায় এফবিসিসিআই-এর নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার নতুন বাণিজ্য বিধিমালা প্রণয়নের পর ব্যবসায়ী নেতাদের চাপে তা পুনঃসংশোধনের উদ্যোগ নেয়। তবে সংশোধনের কাজ শেষ না করেই দায়িত্ব ছাড়ে তারা। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলেও বিধিমালা সংশোধনে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ফলে এফবিসিসিআই নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে সংগঠনটির কার্যক্রমেও—ফেডারেশনে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ও যাতায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরেই অর্থনীতি নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে ৯ শতাংশের আশপাশে স্থির থাকায় বাজারে চাপ কমছে না। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে ১৪–১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলছে।
এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছে। উৎপাদন খরচ কমার কোনো লক্ষণ না থাকলেও কর ও ভ্যাটের চাপ বছর বছর বেড়েই চলেছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন এক সময়ে ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারকদের সামনে কার্যকরভাবে তুলে ধরার মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব না থাকায় সার্বিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২৪’এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে দেশের এফবিসিসিআইতে অস্থিরতা তৈরি হয়। পরিচালনা পর্ষদের পদত্যাগের দাবিতে সদস্যদের একাংশ সক্রিয় হয়ে উঠলে শেষ পর্যন্ত সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১১ সেপ্টেম্বর এফবিসিসিআইয়ের পর্ষদ বাতিল করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন-এর সদস্য মো. হাফিজুর রহমান-কে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে পারেননি। পরবর্তীতে দেড় মাস প্রশাসক পদ শূন্য থাকার পর গত নভেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান-কে নতুন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। তাকে ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে দায়িত্ব হস্তান্তরের নির্দেশ দেওয়া হলেও ইতোমধ্যে ছয় মাস পেরিয়ে গেছে, কিন্তু নির্বাচন এখনও অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।
জানা যায়, দেশের ৪০১টি পণ্যভিত্তিক বাণিজ্য সংগঠন এবং ৮৩টি জেলা ও বিশেষায়িত চেম্বার ফেডারেশনের সদস্য। এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্ব নির্বাচনে এসব চেম্বার ও বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা ভোট দিয়ে থাকেন। ফেডারেশনে ভোট না হওয়ার কারণে অনেক বাণিজ্য সংগঠনেও ভোট আটকে রয়েছে।
চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে কথা বলেছেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘ফেডারেশন হচ্ছে ক্ষুদ্র ও বড় ব্যবসায়ীদের সংগঠন। তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণে দর–কষাকষি করে থাকে ফেডারেশন। দীর্ঘদিন ধরে কমিটি না থাকায় ব্যবসায়ীরা কথা বলার জন্য কোনো ফোরাম পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনে ২০ মাস ধরে পর্ষদ না থাকাটা দুঃখজনক। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধন করে নির্বাচন দেওয়া জরুরি।’
এফবিসিসিআইয়ের সংস্কার
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর নেতৃত্ব কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীকে সভাপতির জন্য মনোনীত করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি এফবিসিসিআই থেকেও নির্বাচন উধাও হয়ে গিয়েছিল। ২০১৯ ও ২০২১ সালে কোনো ভোট ছাড়াই সভাপতি হন যথাক্রমে শেখ ফজলে ফাহিম ও মো. জসিম উদ্দিন। সর্বশেষ ২০২৩ সালে পণ্যভিত্তিক সংগঠন বা অ্যাসোসিয়েশন অংশে ভোট হয়েছিল। তবে সেবারও ভোট ছাড়াই সভাপতি হয়েছিলেন মাহবুবুল আলম।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এফবিসিসিআইয়ের সাধারণ পরিষদের সদস্য—এই ব্যানারে যাঁরা পর্ষদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন, পরে তাঁরাই এফবিসিসিআইয়ের বৈষম্যবিরোধী সংস্কার পরিষদ গঠন করেন। তাঁরা মনোনীত পরিচালক প্রথা বাতিল, পর্ষদের সদস্যসংখ্যা কমানোসহ কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব দেন। সেসব প্রস্তাব রেখে গত বছরের মে মাসে বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়।
নতুন বিধিমালায় এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের আকার ছোট ও মনোনীত পরিচালকের সংখ্যা কমানো হয়। ফেডারেশনের সর্বশেষ পর্ষদ ছিল ৮০ জনের। এর মধ্যে মনোনীত পরিচালক ছিলেন ৩৪ জন। বিধিমালা সংশোধন করে পর্ষদের আকার কমিয়ে ৪৬ জনে নামিয়ে আনা হয়। তার মধ্যে চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ৫ জন করে ১০ জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন। এর বাইরে নারী চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে ১ জন করে ২ জন মনোনীত পরিচালক পর্ষদে যুক্ত হবেন।
বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর ফেডারেশনের প্রথম নির্বাচনে অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে সভাপতি এবং চেম্বার গ্রুপ থেকে জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি নির্বাচিত হবেন। অন্যদিকে পর্ষদে ১২ জন মনোনীত পরিচালকদের ফেডারেশনের সাধারণ পরিষদের সদস্য হতে হবে। দুই বছরের মেয়াদের জন্য গঠিত সাধারণ পরিষদের প্রত্যেক সদস্যকে এককালীন ২০ হাজার টাকা নিবন্ধন ফি দিতে হবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এফবিসিসিআইয়ের কাজ হচ্ছে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করা, ব্যবসায়ীদের সুবিধা–অসুবিধা দেখা। দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ব্যবসায়ী নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় আমরা চাই, সংস্কার শেষে দ্রুত ভোটের মাধ্যমে প্রকৃত ব্যবসায়ী প্রতিনিধি নির্বাচিত হোক।’
যে কারণে আটকে আছে এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন
নতুন বিধিমালা জারির দুই সপ্তাহের মধ্যেই এফবিসিসিআই-এর নির্বাচনী বোর্ড গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। গত ১৮ জুন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, দুইজন সহসভাপতি এবং ৩০ জন পরিচালক নির্বাচনের কথা ছিল। তবে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর দাবির মুখে পরবর্তীতে নির্বাচনের সময়সূচি ৪৫ দিন পিছিয়ে দেওয়া হয়, ফলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াই অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
নতুন বিধিমালায় বলা হয়, ফেডারেশনের পরিচালনা পর্ষদে টানা সর্বোচ্চ দুবার থাকা যাবে। তারপর একবার বিরতি দিয়ে আবার নির্বাচন করা যাবে। এই নিয়ম ভবিষ্যতের পাশাপাশি বিগত সময়ের জন্যও প্রযোজ্য করা হয়। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালায় থাকা এই বিধান নির্বাচনের তফসিলেও রাখা হয়েছিল। তাতে সর্বশেষ গত দুই পর্ষদে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়েন। তাতে ব্যবসায়ীদের একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়। ক্ষুব্ধ একাধিক ব্যবসায়ী এ নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন। তারপর নির্বাচনপ্রক্রিয়া থমকে যায়।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এফবিসিসিআইয়ের সহায়ক কমিটির সাবেক সদস্য আবুল কাশেম হায়দার গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘ভালোর জন্য আমরা ফেডারেশন থেকে স্বৈরাচার দূর করলাম; কিন্তু এখন ফেডারেশন হয়ে পড়েছে নেতৃত্বহীন। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা সংশোধনের কাজটি এক দিনেই করা সম্ভব। অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীও বিষয়টি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত। তারপরও বিধিমালা সংশোধনের কাজটি কেন ধীর গতিতে চলছে, সেটি আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।’
নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (চলতি দায়িত্ব) ও এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আবদুর রহিম খান। তিনি বলেন, ‘সংশোধিত বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা চলতি সপ্তাহে ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া হবে মতামতের জন্য। এরপর অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করে বিধিমালা চূড়ান্ত করা হবে। বিধিমালা সংশোধন হয়ে গেলে নির্বাচনে আরও কোনো বাধা থাকবে না।’
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It