প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির নারায়ণগঞ্জ শাখার বিরুদ্ধে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি জালিয়াতি, অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং গ্রাহকদের নামে বিপুল অঙ্কের ভুয়া ঋণ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের কারণে ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।
শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ডয়েস ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফুর রহমান।
তিনি বলেন, “নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে আমাদের বিভিন্ন কোম্পানির নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর কিছুই আমরা জানতাম না।
“আমাদের অগোচরে ব্যাংক কর্মকর্তারা তাদের প্রধান কার্যালয় ও চেয়ারম্যানের যোগসাজশে এসব অনিয়ম করেছেন। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে পারবে না।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে ব্যবসায়ীবান্ধব উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা চাই, বিষয়টি আবার যাচাই-বাছাই করা হোক। আমরা অনেক আগ থেকেই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলাম।
“বাংলাদেশ ব্যাংকে আমরা ২২ বার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাইনি। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল সে সময় আমাদের অনুমতি ছাড়াই ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছেন।”
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসির নারায়ণগঞ্জ শাখার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে ব্যবসা পরিচালনা করলেও ২০১৭ সাল থেকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে জাল সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করেন ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। এসব কৃত্রিম কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে একাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়, যেখানে বাস্তবে কোনো কাঁচামাল সরবরাহ হয়নি। পরে ওই এলসির বিপরীতে তৈরি দায় চলতি হিসাবের মাধ্যমে নিষ্পত্তি দেখিয়ে অবৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার থেকে ডলার কেনা হয়।
লিখিত বক্তব্যে আরিফুর রহমান দাবি করেন, বাজারদরের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ টাকা বেশি দামে ডলার কেনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এ ছাড়া রপ্তানি নথির বিপরীতে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অর্থ চলতি হিসাবে জমা দিয়ে পরে সেই অর্থ ব্যবহার করে ডলার কেনা এবং কথিত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির দায় পরিশোধ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক একতরফাভাবে ফোর্সড লোন ও ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করে বিপুল সুদ আরোপ করেছে, যা গ্রাহকদের কোনো নোটিশ ছাড়াই করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন লঙ্ঘন করে চলতি হিসাব, নগদ জমা ও ঋণ সৃষ্টি করে এলসি সমন্বয় করা হয়েছে। তবে বারবার পূর্ণাঙ্গ হিসাব চাওয়া হলেও ব্যাংক তা দেয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে ফাঁকা চেক ব্যবহার করে অর্থঋণ আদালতে মামলা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, পুনঃতফসিলের শর্তে স্বাক্ষর না করলে এলসিসহ অন্যান্য ঋণসুবিধা বাতিলের হুমকি দেওয়া হতো। এতে কারখানার কার্যক্রম ও শ্রমিকদের বেতন ঝুঁকির মুখে পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হয়ে কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দেয় এবং স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পরে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুনঃতফসিলে রাজি হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তা বাতিল করে দেয়। ফলে ২৩টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ব্যাংকের চাপ ও ঋণজনিত মানসিক উদ্বেগে দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারা গেছেন। এর মধ্যে টোটাল ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসিবউদ্দিন মিয়াকে ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক দিনেই ৩৭ বার ফোন করে স্বাক্ষরের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এমন অসহনীয় মানসিক চাপের কারণে একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এ ছাড়া ওয়েস্ট অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুদকে মিথ্যা অভিযোগের কারণে সৃষ্ট মানসিক চাপে ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অনবরত চাপ ও ঋণসংকটে স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়েছেন আরও একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ব্যাংকের আরোপিত ঋণের পরিমাণ প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী ২৬টি প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০২৩ সাল পর্যন্ত কোনো বড় অস্বাভাবিক দায় না থাকলেও ২০২৪ সালে হঠাৎ বিপুল অঙ্কের ঋণ দেখানো হয়, যা তাঁরা অযৌক্তিক ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নিট রিফ্লেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিল মোহাম্মদ ইমরান বলেন, “প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে আমাদের নামে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। সে সময় নারায়ণগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন মো. শহিদ হাসান মল্লিক। শাখার দ্বিতীয় কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমানসহ আরও অনেক কর্মকর্তা নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনেক কিছুর হিসাব আমাদের দেওয়া হয়নি।”
তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ব্যাংকে যখন এসব অনিয়ম হয়েছে, তখন বাংলাদেশ ব্যাংক কেন তদন্ত করে তা ধরতে পারেনি?
“বাংলাদেশ ব্যাংক তো প্রতি বছর নিরীক্ষা করে, আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দিয়েও অডিট করানো হয়। তাহলে এসব বিষয় তখন কীভাবে এড়িয়ে গেল?”
তিনি আরও বলেন, “এখন বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে আমাদের নামে যে দায় দেখাচ্ছে, তা তারা প্রমাণ করতে পারবে না।”
ব্যবসায়ীরা বলেন, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। এতে টাকা পরিশোধের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মসংস্থান হারাবেন এবং দেশের রপ্তানিও কমবে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু থাকলেই টাকা পরিশোধ করা সম্ভব। তাই তাঁরা প্রকৃত দায় নির্ধারণ করে তা পরিশোধে আগ্রহী। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকবে এবং প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হওয়া থেকে রক্ষা পাবেন।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত এবং স্বনামধন্য অডিট ফার্মের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষার দাবি জানান ব্যবসায়ীরা। এ বিষয়ে গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে লিখিত আবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তাঁরা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টোটাল ফ্যাশন লিমিটেডের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহরাব বিন হাসিব, জননী ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম পোদ্দার প্রমুখ।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It