খেলাপি ঋণের চাপ ও দীর্ঘদিনের অনিয়মে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধনভিত্তি বড় সংকটে পড়েছে। গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে অন্তত ২০টি ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এর প্রভাবে পুরো ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার ৬০ কোটি টাকার। এক বছরের ব্যবধানে এ ঘাটতি বেড়েছে ৩৭৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেমে গেছে ঋণাত্মক ধারায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ২৩টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ১৯টি ব্যাংকের ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা। পরে ডেফারেল সুবিধা দেওয়ার পর ওই বছরের চূড়ান্ত হিসাবে ঘাটতি কমে ৯৪ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকায় নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, ঝুঁকিভিত্তিক মোট সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ন্যূনতম ১০ শতাংশ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৫ শতাংশ ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার রাখতে হয়। পাশাপাশি ব্যাসেল-৩ কাঠামোর আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে লিভারেজ অনুপাত ৪ শতাংশে উন্নীত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে আলোচ্য ২০টি ব্যাংক এসব শর্ত পূরণ করতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি, বিশেষায়িত ২টি এবং বেসরকারি ১৪টি ব্যাংক।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ প্রবৃদ্ধিই মূলধন সংকটের প্রধান কারণ। গত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পরে পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ায় ডিসেম্বর শেষে তা কমে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকায় নামে। এরপরও খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি রয়েছে।
উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে পারেনি অনেক ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। এতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের চাপ আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, একটি ব্যাংকের কার্যকারিতা মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান সূচক হলো মূলধন পর্যাপ্ততা। উন্নত দেশগুলোতেও ব্যাংকের সক্ষমতা যাচাইয়ে এই সূচককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বছরের পর বছর মূলধন ঘাটতি নিয়েই অনেক ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে ৬২টি ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতায় টিকে থাকতে পারছে না। তবু সেগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কার্যকর সমাধান নয়।
সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জনগণের করের টাকায় দুর্বল বেসরকারি ব্যাংককে টিকিয়ে রাখার যৌক্তিকতা নেই। কোনো ব্যাংক নিজস্ব সক্ষমতায় টিকে থাকতে না পারলে তাকে বাজার থেকে সরে যেতে দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে একীভূত হওয়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৪ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের ঘাটতি ২৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৩০ হাজার ৫৪৪ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ২৫ হাজার ৯১৫ কোটি এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সবচেয়ে বেশি, ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৩৫ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৪ হাজার ১৮৯ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।
বেসরকারি খাতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি ন্যাশনাল ব্যাংকের, ৯ হাজার ৩২ কোটি টাকা। এবি ব্যাংকের ঘাটতি ৬ হাজার ৫৫২ কোটি, পদ্মা ব্যাংকের ৫ হাজার ৮৩৭ কোটি এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৪ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, এনআরবিসি ব্যাংক ও সীমান্ত ব্যাংক মূলধন ঘাটতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে নতুন করে ঘাটতির তালিকায় যুক্ত হয়েছে সিটিজেন ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে সার্বিকভাবে সিআরএআর কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে তা নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৯০ শতাংশ। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে সিআরএআর ইতিবাচক অবস্থানে ছিল।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It