1. news@gmail.com : news :

গোয়েন্দাদের ‘স্টপলিস্ট’: যৌক্তিকতা, প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

  • প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পরপরই দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে আমূল পরিবর্তন আসে। ওই দিনই ঢাকাসহ দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি ভিত্তিতে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সংশ্লিষ্ট কেউ যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন। প্রায় ছয় ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর পুনরায় ফ্লাইট চলাচল স্বাভাবিক হয়।

এই সময়ের মধ্যেই সক্রিয় হয়ে ওঠে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তারা দ্রুত একটি ‘স্টপলিস্ট’ তৈরি করে, যেখানে নির্ধারণ করা হয় কারা বিমানবন্দর ব্যবহার করে বিদেশে যেতে পারবেন না। নিয়ম অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসআই), প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) সমন্বিত ছাড়পত্র (ক্লিয়ারেন্স) বাধ্যতামূলক করা হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশত্যাগ রুখতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দ্রুত ‘স্টপলিস্ট’ তৈরি করে। এই তালিকার ভিত্তিতে বিমানবন্দরে অনেককে আটকে দেওয়া হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, স্বচ্ছতা এবং আইনি যৌক্তিকতা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে গুরুতর প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে

পরবর্তী সময়ে এই তালিকার ভিত্তিতে একের পর এক ব্যক্তিকে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয় এবং অনেককে বিদেশযাত্রা থেকে বিরত রাখা হয়। তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ‘স্টপলিস্ট’ ঘিরে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের সময়ে বিমানবন্দরে একাধিক ঘটনার পর এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, স্বচ্ছতা এবং যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

কারা ছিলেন স্টপলিস্টে

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ৫ আগস্টেই এনএসআই, ডিজিএফআই ও এসবি পুলিশ যৌথভাবে একাধিক বৈঠকে বসে। এসব বৈঠকে পৃথক মূল্যায়নের ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করা হয়। পরে সেটিই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় ‘স্টপলিস্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

এই তালিকায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন ও সাবেক এমপি, মন্ত্রীসহ তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাদের নাম ছিল। এর মধ্যে যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগ উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিক, ব্যাংক খাতের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং অর্থপাচারে সন্দেহভাজন ব্যক্তিরাও তালিকাভুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য শ্রেণিতে ছিলেন।

গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছাড়াও তালিকায় ছিলেন রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত কিছু ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং কিছু সাংবাদিক। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা ছিল, সাংবাদিকরা দেশের বাইরে গিয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করতে পারেন, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই আশঙ্কায় সাংবাদিকদের একটি স্টপলিস্ট তৈরি হয়।

গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাংবাদিক এবং আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠদের এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বা সঠিক যাচাই ছাড়াই অনেক নাম যুক্ত করায় তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি এসবি পুলিশও এই ব্যবস্থার যৌক্তিকতা এবং কোন মানদণ্ডে নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে

সূত্র আরও জানায়, ৫ আগস্টের দিন একটি আশঙ্কা ছিল যে বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকরা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে অর্থ পাচার করতে পারেন, যা দেশকে অস্থিতিশীল করবে। তখন গোয়েন্দারা একটি নীতিগত সিদ্ধান্তও নেন। সিদ্ধান্তটি ছিল— প্রতিটি বড় শিল্পগোষ্ঠী গ্রুপ থেকে অন্তত একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি দেশে থাকবেন। বাকিরা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন। তবে তাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য ও ফিরে আসা নিশ্চিত করতে হবে।

এনএসআই, ডিজিএফআই ও এসবির পৃথক তালিকা: নানা প্রশ্ন

এদিকে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তিন সংস্থার তালিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। গোয়েন্দারা জানান, তালিকা তৈরির সময় পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই অনেক নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কোথাও কোথাও যাচাই ছাড়াই সিদ্ধান্ত এসেছে। এতে তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

স্টপলিস্ট নিয়ে সর্বপ্রথম পর্যবেক্ষণ দেয় এসবি পুলিশ। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, অনেকেই গোয়েন্দাদের স্টপলিস্টের বিষয়ে জানতেন না। ফলে কাউকে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলে সেই দায় যেত ইমিগ্রেশন পুলিশের ওপর, যা এসবির অধীনে রয়েছে। বিষয়টি এসবির পক্ষ থেকে তাদের প্রধান এবং পুলিশ সদরদপ্তরে মৌখিকভাবে অবগত করা হয়।

এছাড়াও এসবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্টপলিস্টের তালিকায় কোন মানদণ্ডে নাম ঢুকেছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় এই স্টপলিস্ট ব্যবস্থার কোনো যৌক্তিকতা আদৌ আছে কি না— এ বিষয়েও প্রশ্ন তোলে তারা।

সূত্র জানায়, একাধিক ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, স্টপলিস্ট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত রেফারেন্সও ভূমিকা রেখেছে। কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা যায়। এমনকি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ফোনে যোগাযোগ করে ইমিগ্রেশন পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে— এমন অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনায় এসেছে।

২০২৫ সালের মে মাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ‘রিফর্মড আওয়ামী লীগ’ গঠনের আলোচনা শোনা যাচ্ছিল। ঠিক তখনই বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পার হয়ে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন আবদুল হামিদ। এই ঘটনাকে ঘিরে তখনই ‘স্টপলিস্ট’ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিএনপি সমর্থিত একটি পত্রিকার সাংবাদিককে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় স্টপলিস্টে থাকার কারণ দেখিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতে সৌদি আরবে উমরাহর উদ্দেশে যাওয়ার সময় আটকে দেওয়া হয় দৈনিক অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে।

এ বিষয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশের সভাপতি সাজ্জাদ আলম তপু বলেন, ‘কোনো সাংবাদিক বা নাগরিকের ক্ষেত্রে দেশের বাইরে যাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত করা তার সাংবিধানিক অধিকার পরিপন্থী। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সাংবাদিক সমাজের মধ্যে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা পেশাগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৩ মে চীনে যাওয়ার পথে বিমানবন্দরে বাধার মুখে পড়েন নিউজনেক্সট সম্পাদক ও ওকাব (OCAB) সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু। নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে মিঠু জানান, ইমিগ্রেশন কাউন্টারে বোর্ডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর হঠাৎ তাকে আলাদা করে নেওয়া হয় এবং জানানো হয় যে তার বিদেশযাত্রায় ‘আপত্তি’ রয়েছে। পরে তাকে ইমিগ্রেশন পুলিশের বিশেষ সুপারিনটেনডেন্টের কক্ষে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যেখানে তার পরিচয়, পেশাগত দায়িত্ব এবং ভ্রমণ সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত তার পাসপোর্ট ফেরত দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, এসবি ও এনএসআই’র ক্লিয়ারেন্স থাকা সত্ত্বেও ডিজিএফআই ক্লিয়ারেন্স দিতে দেরি করে। ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার আগেই ফ্লাইট রওনা হয়ে যায়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে এমন তালিকা তৈরি করা স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত রিভিউ (পর্যালোচনা) ছাড়া তা চালু থাকলে সমস্যা তৈরি হয়। এতে নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যদি কোনো হত্যা মামলা বা গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ না থাকে এবং তারা কোনো অপরাধে সরাসরি জড়িত না হন, তাহলে বিমানবন্দরে তাদের আটকানো বা হেনস্তা করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে সিনিয়র ও প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিকরা, যাদের পেশাগত পরিচিতি সর্বজনবিদিত, তাদের এভাবে হয়রানি বা অসম্মানিত করা অত্যন্ত দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতাকে হত্যার অভিযোগে অন্তত ১৪০ জন সাংবাদিককে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বা হত্যা মামলার আসামি করা হয়। কোনো ধরনের অনুসন্ধান ছাড়াই এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন পাঁচজন সাংবাদিক। কোনো তদন্ত ছাড়া এভাবে সাংবাদিকদের আসামি ও গ্রেপ্তার নিয়ে সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন মহল থেকে নিন্দা জানানো হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত ৮ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। কিন্তু কোনো মামলা প্রত্যাহার হয়নি।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর

প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It