দিনদুপুরে এক যুবককে ধাওয়া করে একদল কিশোর। তাদের হাতে চাপাতিসহ ধারালো অস্ত্র। কয়েকজনের কোমরে ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্র। প্রাণভয়ে যুবক ‘বাঁচাও’ ‘বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি রক্ষা পাননি। কিশোর সন্ত্রাসীরা এক পর্যায়ে তাঁকে ধরে ফেলে। তারপর অনেকটা ফিল্মি কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করে।
গত শুক্রবার পুরান ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার এই ভয়ংকর চিত্র থানার পুলিশের নথিভুক্ত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাজিয়া মিছিল থেকে দাবড়িয়ে ধরে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী যুবক জাকির হোসেনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এমন নৃশংস ঘটনা প্রকাশ্যে প্রায়ই ঘটছে।
অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল থাকে জনাকীর্ণ স্থান বা সড়ক। আর এসব অপরাধে যারা জড়িত, তারা বেশির ভাগই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। এদের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন কিশোর গ্যাংয়ের একটি হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছে।
র্যাবের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে বিগত সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে সারা দেশে ২৩৭টি কিশোর গ্যাংয়ের নাম উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ নতুন তালিকায় ১০২টি গ্যাং যোগ হয়েছে। হালনাগাদ তালিকা ধরে এ ব্যাপারে অভিযান শুরু করেছে র্যাব।
এ ব্যাপারে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী গতকাল বুধবার বলেন, নতুন-পুরনো মিলিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে সারা দেশে। কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা ধরে র্যাবের অভিযান চলছে। এরই মধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্য আটক হয়েছে। তবে সামাজিকভাবেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা : একই পাড়া ও মহল্লার বখে যাওয়া কিশোর-তরুণরা একজোট হয়ে কিশোর গ্যাং তৈরি করছে। এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও রয়েছে। এরা বাহারি ও চটকদার নাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৎপর হয়। রাজধানীতে মোহাম্মদপুর ও উত্তরায় তাদের তৎপরতা বেশি। একটি দলে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য থাকে, যাদের বেশির ভাগই মাদকাসক্ত। তাদের সঙ্গে থাকে ধারালো ছুরি, চাপাতি ও আগ্নেয়াস্ত্র। আগ্নেয়াস্ত্র। পর্যায়ক্রমে তারা ভয়ংকর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তারা মূলত বড় ভাইয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করে।
মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে স্টার বন্ড, লাড়া দে, গ্রুপ টোয়েন্টি, ফিল্ম ঝিরঝির, দেখে ল, চিনে ল, লেভেল হাই, কোপাইয়া দে রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নামে আরো নতুন কিছু গ্যাং যোগ হয়েছে। ধানমণ্ডিতে রয়েছে নাইন এমএম, একে ৪৭-এর সঙ্গে ফাইভ স্টার, ইলেভেন স্টার, সেভেন স্টারসহ আরো একাধিক গ্রুপ। তেজগাঁওয়ে জুম্মন গ্যাং, পাংকু গ্যাংসহ আরো অনেক গ্যাং রয়েছে। উত্তরায় একসময় বিল বস, নাইন স্টার, পাওয়ার বয়েজ, সুজন ফাইটার, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, আলতাফ জিরো, ত্রিগোল, তুফান ও নাইন এমএম গ্রুপের দাপট ছিল। এখন তাদের সঙ্গে আরো অনেক গ্রুপ সক্রিয় রায়েছে। মিরপুর এলাকায় বিচ্ছু বাহিনী, রিপন গ্যাং, সুমন গ্যাংয়ের সঙ্গে বিভিন্ন নামে আরো অনেক নতুন গ্যাং রয়েছে। পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোবরা গ্যাং, জুম্মন গ্যাং, বড় পোলা গ্যাংসহ আরো অনেক গ্যাং তৎপর। এর বাইরে সারা দেশে চটকদার অদ্ভুত নামের কিশোর গ্যাং ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে। এরা ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করছে। তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্র।
কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংসতা : গত শুক্রবার রাতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলায় প্রকাশ্যে একদল কিশোরকে সিগারেট খেতে বারণ করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়। এই কিশোর সন্ত্রাসীরা পরে ছয়জনকে গুলি করে। সংকটাপন্ন অবস্থায় তারা এখন হাসপাতালে।
এর কয়েক দিন আগে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় একজনকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এভাবে প্রতিদিন কিশোর গ্যাং সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েই চলেছে। এসব কিশোরের বেশির ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সমাজে বর্তমানে সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোর গ্যাং জড়িত থাকার বিষয়টি দেখা যাচ্ছে। এদের দমনে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, শিক্ষকসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
আইন-শৃৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রতিবেদনে তথ্য : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করতে না পরলে সারা দেশে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরো বাড়তে পারে। কিশোর গ্যাং আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তাদের কর্মকাণ্ড সমাজে আরো অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। কিশোর অপরাধীরা নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শান্তি-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। এদের নিয়ন্ত্রণ করতে হলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া থেকে তাদের বের করে আনতে হবে।
ধরাছোঁয়ার বাইরে পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদাররা : কিশোর গ্যাং বেড়ে ওঠার নেপথ্যে থাকেন বড় ভাইয়েরা। তাঁরা অনেকে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের ছাত্রচ্ছায়ায় ও উসকানিতে এসব কিশোর-তরুণ আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
তাদের সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে কিশোর গ্যাং সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদাররা। এসব গ্যাং সদস্যের নেপথ্যের শক্তি বা আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে।
এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত কিশোরদের মধ্যে ‘হিরোইজমের’ চিন্তা-ভাবনা থেকে গ্যাং কালচার শুরু।
ডিএমপির একাধিক প্রতিবেদন যা বলছে : ডিএমপি সূত্র বলছে, রাজধানী থেকেই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু। শুরুতে এদের তৎপরতা সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া যায়। ২০২২ সালের শেষ দিকে পুলিশের একটি প্রতিবেদন তৈরি করে ডিএমপি। তখন ওই প্রতিবেদনে রাজধানীসহ সারা দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং থাকার তথ্য উঠে আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ছিল ৬৬টি এবং চট্টগ্রামে ৫৭টি।
পুলিশের অন্য এক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বর্তমানে শুধু রাজধানীর আটটি ক্রাইম জেনের বিভিন্ন থানা এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক কিশোর গ্যাং রয়েছে।
ডিএমপি সূত্র বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল-পরবর্তী সময়ে রাজধানীতে বেশির ভাগ খুনের ঘটনায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের হালনাগাদ তালিকা আমাদের কাছে আছে। এদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’
পুলিশের অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, যারা কিশোর, তাদের দেখভাল করা, বিশেষ করে সন্তানের জন্য মা-বাবারও দায়িত্ব রয়েছে। তারা কী করে, কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, এগুলো দেখা প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব।
গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ। কিশোর গ্যাং মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতেও তারা জড়িয়ে পড়ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর পরও এদের নিয়ন্ত্রণে আমরা চেষ্টা করছি।’
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ : কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া সরকারি একাধিক সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি সুষ্ঠু বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। ইন্টারনেটে কিশোরদের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন অ্যাপ চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে। এলাকাভিত্তক তালিকা তৈরি করে কিশোর গ্যাংয়ের ‘হটস্পট’ শনাক্ত করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। এ কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply