শেয়ারবাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ চেয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ জন্য ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমে নির্ধারিত অর্গানোগ্রাম বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে দেশের প্রধান এই স্টক এক্সচেঞ্জ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ অনুরোধ জানায় ডিএসই। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার চিঠিটি পাঠিয়েছেন।
চিঠিতে ডিএসই বলেছে, ব্যবসার ধরন ও প্রয়োজনের পরিবর্তন, প্রযুক্তির উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অর্গানোগ্রাম ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের অংশ হওয়ায় এতে পরিবর্তন আনতে অতিরিক্ত অনুমোদন ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক পরিবর্তন দ্রুত বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
একই বিষয়ে এর আগে গত ১৫ মার্চ ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বিএসইসিকে চিঠি দিয়েছিলেন। সেই আবেদনের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ চিঠিতে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে অনুমোদনের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম নিয়ে বিএসইসির সঙ্গে আগামী মাসেই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। স্কিমে পাঁচ বছর পর পর্যালোচনার বিধান থাকলেও কোনো কারণে এতদিন তা করা হয়নি। অন্যান্য দেশের ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডিএসইর চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, অর্গানোগ্রাম একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো। ব্যবসায়িক প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এ কাঠামো নিয়মিত পরিবর্তন ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু অর্গানোগ্রামকে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের অংশ হিসেবে রাখলে প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য অতিরিক্ত অনুমোদন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে বলে মনে করছে ডিএসই।
স্টক এক্সচেঞ্জটির মতে, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মালিকানা, পরিচালনা এবং লেনদেনের অধিকারকে পৃথক করা। এর মাধ্যমে মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও ট্রেডিং কার্যক্রমের মধ্যে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে একটি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত প্রশাসনিক কাঠামো ডিমিউচুয়ালাইজেশনের মৌলিক অংশ নয়।
এই যুক্তিতে ডিএসই মনে করছে, অর্গানোগ্রামকে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের পরিবর্তে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদিত অভ্যন্তরীণ নীতিমালার আওতায় রাখা বেশি যৌক্তিক। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে।
চিঠিতে কোম্পানি আইন ও প্রযোজ্য করপোরেট গভর্ন্যান্স নীতিমালার বিষয়টিও তুলে ধরেছে ডিএসই। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে অর্গানোগ্রাম অনুমোদন, সংশোধন ও সময়োপযোগী করার দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের ওপর থাকা উচিত। ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমে অর্গানোগ্রাম স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকলে পর্ষদের এই দায়িত্ব পালনে অপ্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াগত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমান শেয়ারবাজারের দ্রুত পরিবর্তনের বিষয়টিও বিএসইসির নজরে এনেছে ডিএসই। নতুন প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্কার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্টক এক্সচেঞ্জের অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
ডিএসইর মতে, অর্গানোগ্রাম ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের বাইরে রাখা হলে এ ধরনের পরিবর্তন দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিএসইসির নির্দেশনা ও অনুমোদন মেনে চলার বিষয়েও প্রতিষ্ঠানটি তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
ডিএসই তাদের আবেদনে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের ৯.২.৩ ধারার কথাও উল্লেখ করেছে। ওই ধারায় ডিএসইর অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে সর্বোত্তম সাংগঠনিক কাঠামো নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ডিএসইর যুক্তি, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্গানোগ্রামকে একটি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় কাঠামোর মধ্যে রাখা জরুরি নয়। বরং সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী তা পরিবর্তন ও উন্নত করার সুযোগ থাকা উচিত।
এ ক্ষেত্রে দেশের দ্বিতীয় স্টক এক্সচেঞ্জ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) উদাহরণও দিয়েছে ডিএসই। চিঠিতে বলা হয়েছে, সিএসইর অর্গানোগ্রাম ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমের অংশ করা হয়নি।
ডিএসইর ক্ষেত্রে ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিমে যে অর্গানোগ্রাম দেখানো হয়েছিল, সেটিও মূলত একটি কাঠামোগত চিত্র বা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরে এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট, ২০১৩-এর আওতায় অনুমোদনের জন্য সেটি বিএসইসির কাছে জমা দেওয়া হয়।
সবশেষে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ বলেছে, ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম থেকে অর্গানোগ্রাম বাদ দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা বাড়বে। একই সঙ্গে সাংগঠনিক পরিবর্তনে নমনীয়তা তৈরি হওয়ার ফলে করপোরেট গভর্ন্যান্সও আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It
Leave a Reply