ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেকসই করতে দেশে উচ্চাভিলাষী বাজেটের চেয়ে বর্তমান বাস্তবতায় ব্যবসাবান্ধব ও স্থিতিশীল নীতিই এখন বেশি জরুরি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ দেশি-বিদেশি নানা বাস্তবতায় এবারের বাজেটে বড় কোনো ছাড় মিলবে না বলেও মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরাতে নিয়মতান্ত্রিক ও যুক্তিসংঘত বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি।
দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদ সরকারের কার্যকলাপে অতিষ্ট ছিল দেশের ব্যাংক-শেয়ারবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতি। তবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসইর ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম সোনালী নিউজকে বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেকসই করতে বর্তমান সরকার যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, দ্বৈত কর ব্যবস্থা এড়ানো এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির করপোরেট কর কমানোর দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম শেয়ারবাজার হলেও বাংলাদেশে এখনো এ খাত অনেকটাই পিছিয়ে। অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই খাত মূলধনের জোগান ও মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি করলেও এখনও অস্থিরতা, অসন্তোষ ও বিনিয়োগকারীদের অনাস্থা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাধারণ সম্পাদক ও এমটিবি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুমিত পোদ্দার সোনালী নিউজকে বলেন, নতুন সরকারের ম্যান্ডেটের আলোকে, বাজেটকে মানি মার্কেট ও ক্যাপিটাল মার্কেটকে শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদী উৎস হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আসন্ন বাজেটে সরকারের সঠিক প্রতিফলন দেখানো খুবই জরুরি।
তিনি বলেন, পাশাপাশি, ব্যাংকগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে তাদের ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে সম্ভাব্য দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা যায়। আর ক্যাপিটাল মার্কেটের দুর্বলতা কাটাতে, বাজারে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ, স্থিতিশীল নীতি এবং স্বচ্ছ নিয়মাবলী প্রয়োজন। এসব দিক বিবেচনায়, আমরা বাজেটকে মানি ও ক্যাপিটাল মার্কেটের জন্য একটি শক্তিশালী উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল সোনালী নিউজকে বলেন, আসন্ন বাজেট হতে হবে ব্যবসাবান্ধব। কর ব্যবস্থা, ভ্যাট ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো হতে সহজ। তবেই ব্যবসায়ীরা উৎসাহী হবে আগ্রহ বাড়বে ব্যবসা বাড়াতে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা কর বা ভ্যাট দিতে আগ্রহী হবে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে বাজেট এমন কিছু না রাখা যাতে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বাড়াতে ভয় পায়। এমন কিছু চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না যার ফলে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হবে। ব্যবসায়ীরা যত বেশি ব্যবসায় মনোযোগী হবে দেশের অর্থনীতি তত বেশি অগ্রসর হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের উৎসাহী করতে বাজেট হতে হবে সহনীয় বা ব্যবসাবান্ধব। আর বাজেট যদি চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে অন্যায় পথ বেছে নিবে, যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা তৈরি পোশাকশিল্প খাত। সর্ববৃহৎ বেসরকারি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই খাতটি বর্তমানে বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখে। এই খাতের উন্নয়নে এবং বৈশ্বিক চাপের মুখ থেকে বাচাতে সরকারকে অবশ্যই বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, আসন্ন বাজেটে সরকারকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে খাদ্য সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর কর ও ভ্যাটে যথেষ্ট ছাড় দেওয়া। তবে ব্যবসায়ীদের আমদানি সহজ হবে আমদানিমুখি পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে। তাছাড়া বাজেটে ব্যবসায়ীদের উপেক্ষা করে কোন সিদ্ধান্ত নিলে তবে তা দেশের ওভারোল অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে।
বাজেট সামনে রেখে বিভিন্ন খাত সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে কিছু আশার দিক ব্যক্ত করেছেন। ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করা হবে। একই সাথে উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে দেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার, ফান্ড ম্যানেজার এবং আইএফসি থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়াও সরকার দেশে এবং বিদেশে ‘বাংলাদেশ বন্ড’ ফ্লোট করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যেখানে সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে থাকবে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কর ফাঁকি রোধে কোকাকোলা, পেপসি বা বহুজাতিক ও বড় তামাক কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মার্কেট শেয়ার যাচাই করে ন্যায্য ট্যাক্স আদায় করা হবে। সাধারণ রেস্টুরেন্ট বা ক্ষুদ্র দোকানদারদের করের আওতায় আনতে এবং কর কর্মকর্তাদের হয়রানি থেকে বাঁচাতে বছরে একটি সহজ ফ্ল্যাট রেট চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কর নীতি প্রণয়নে আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি বিল পাস করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে কেবল কর আদায়কারী নয়, বরং গ্লোবাল অর্থনীতি, স্থানীয় বাণিজ্য এবং হিউম্যান প্রফিটিবিলিটি বোঝেন এমন যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে পলিসি মেকিং বডি গঠন করা হবে।
সরকারের সুনজর কার্যকর দেখতে চায় ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত শেয়ারবাজারের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
প্রযুক্তি সহায়তায়: Star Web Host It